দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে কিছুদিন আগেও মন্দাভাব দেখা যাচ্ছিল। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক উপস্থিতি কমছিল, এমনকি বড় বাজেটের সিনেমাগুলোও প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছিল না। তবে চলতি বছরে এসে সেই চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে একাধিক সিনেমা বক্স অফিসে সফলতা পাচ্ছে, পাশাপাশি সিনেমার শুটিং লোকেশন ঘিরেও দর্শকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। ফলে এসব স্থানে দর্শনার্থীদের ভিড় ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য কিংস ওয়ার্ডেন’ সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সিনেমাটির শুটিং হয়েছে গ্যাংওন প্রদেশের চংনিয়ংপো এলাকায়, যা এখন দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটিতে একসময় নির্বাসিত ছিলেন রাজা কিং ডানজং। জোসন সাম্রাজ্যের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে এক গ্রামপ্রধানের সংগ্রাম এবং সিংহাসনচ্যুত এক তরুণ রাজার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। নির্মাতার দক্ষ পরিচালনায় গল্পটি দর্শকদের কাছে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যস্ত সময়গুলোতে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় আট গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশেষ করে শীতকালীন ছুটি এবং পয়লা মার্চের সরকারি ছুটির সময় ভিড় আরও বৃদ্ধি পায়। শুধু শুটিং লোকেশনই নয়, এর আশপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোতেও পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠছে, যা স্থানীয় ব্যবসা ও পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, শুধু ঐতিহাসিক সিনেমা নয়, ভৌতিক ঘরানার চলচ্চিত্রের শুটিং লোকেশনেও দর্শকদের আগ্রহ বাড়ছে। স্বল্প বাজেটের হরর সিনেমা ‘সালমকজি’ মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই লাভের মুখ দেখেছে। ছবিটির গল্প একটি রহস্যময় জলাধারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যেখানে ভয় ও অজানার আবহ তৈরি করা হয়েছে।
উত্তর চুংচিয়ং প্রদেশে অবস্থিত সেই জলাধারটি আগে থেকেই কিছু মানুষের কাছে ‘ভুতুড়ে স্থান’ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সিনেমার সাফল্যের পর এটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, দর্শনার্থীরা দল বেঁধে বিশেষ করে রাতের বেলায় সেখানে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দীর্ঘ গাড়ির সারির ছবি শেয়ার করছেন, যা স্থানটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছিল। সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাও ৬০ লাখ দর্শকের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। সেই প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের শুরুটা এক শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। চলচ্চিত্রগুলো শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পাচ্ছে না, বরং দর্শকদের মধ্যে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতার আকর্ষণ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিনেমার ভূমিকার বিস্তার। এটি এখন আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। শুটিং লোকেশনগুলো পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে, যার ফলে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানও বাড়ছে।
তবে এই প্রবণতা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বছরের বাকি সময়ে নতুন সিনেমাগুলো মুক্তি পেলে একইভাবে শুটিং লোকেশনগুলোতে দর্শকদের ঢল নামবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তবুও বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র শিল্প আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে, এবং এর প্রভাব পর্দার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তব জগতেও বিস্তৃত হচ্ছে।





Add comment