১২ কোটি বছরের রহস্য উন্মোচন করল জীবাশ্ম

উত্তর-পশ্চিম চীনে ১২ কোটি বছর আগের এক পাখিসদৃশ ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন গবেষকেরা। এই জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের একটি নতুন প্রজাতি শনাক্ত করেছেন, যা প্রাচীন প্রাণীদের বিবর্তন ও চলাচলের ধরন সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে এনেছে। গবেষকদের মতে, আবিষ্কারটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মাইক্রোরেপ্টর নামে পরিচিত ছোট আকারের পালকযুক্ত শিকারি ডাইনোসরদের সম্পর্কে বিদ্যমান ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

জীবাশ্মটি উদ্ধার করা হয়েছে বর্তমান চীনের কানসু প্রদেশের চ্যাংমা অববাহিকা থেকে। প্রায় অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত কাঁধ এবং সামনের ডানার হাড় বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিশ্চিত হন, এটি মাইক্রোরেপ্টর পরিবারের একটি আগে অজানা প্রজাতির প্রতিনিধিত্ব করছে। নতুন এই প্রজাতির নাম রাখা হয়েছে ‘জিয়ান চ্যাংমায়েনসিস’।

গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘জিয়ান’ নামটি এসেছে চীনা পৌরাণিক কাহিনির এক বিশেষ এক-ডানার পাখির নাম থেকে, যার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নতুন আবিষ্কৃত প্রাণীটির কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। অন্যদিকে ‘চ্যাংমায়েনসিস’ অংশটি চ্যাংমা অববাহিকার প্রতি সম্মান জানিয়ে যুক্ত করা হয়েছে, কারণ সেখান থেকেই এই গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্মের সন্ধান মিলেছে।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী অ্যানালস অব কার্নেগি মিউজিয়াম-এ। গবেষকদের মতে, নতুন এই আবিষ্কার মাইক্রোরেপ্টরদের বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতির ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এত দিন পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব চীনের বাইরে মাইক্রোরেপ্টর প্রজাতির নিশ্চিত প্রমাণ খুবই সীমিত ছিল। নতুন শনাক্ত হওয়া ‘জিয়ান চ্যাংমায়েনসিস’ সেই ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এ ছাড়া গবেষকেরা বলছেন, এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে সাম্প্রতিক মাইক্রোরেপ্টর জীবাশ্ম। এর মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, এই পালকযুক্ত ডাইনোসররা বিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী অনুমানের তুলনায় আরও দীর্ঘ সময় পৃথিবীতে টিকে ছিল।

গবেষণার সহলেখক লাম্যানা জানান, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে বর্তমান চ্যাংমা অববাহিকার এলাকায় একসময় উড়তে না পারা ডাইনোসরও বসবাস করত। অথচ অঞ্চলটি মূলত প্রাচীন পাখির জীবাশ্মের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখন পর্যন্ত চ্যাংমা এলাকা থেকে এক শতাধিক পাখির জীবাশ্ম উদ্ধার করা হলেও উড়তে না পারা ডাইনোসরের নমুনা পাওয়া গেছে মাত্র একটি।

গবেষকদের মতে, নতুন এই প্রজাতি অঞ্চলটির জৈবিক ইতিহাস এবং আধুনিক পাখিদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। বিশেষ করে কীভাবে ডাইনোসর থেকে পাখির বিবর্তন ঘটেছে এবং তাদের পরিবেশগত অভিযোজন কেমন ছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই জীবাশ্ম নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

লাম্যানার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘জিয়ান চ্যাংমায়েনসিস’ সম্ভবত স্বল্প সময়ের জন্য আকাশে ভেসে বেড়াতে কিংবা উড়তে সক্ষম ছিল। মাইক্রোরেপ্টরদের পুরো শরীর সাধারণত পালকে আবৃত থাকত। সামনের দুই ডানার পাশাপাশি তাদের পেছনের পায়েও দীর্ঘ পালক ছিল, ফলে দেখতে অনেকটা চার ডানাবিশিষ্ট প্রাণীর মতো মনে হতো।

এই প্রাণীরা মাটিতে চলাফেরা করলেও গাছে ওঠায় ছিল দক্ষ। গবেষকদের ধারণা, আধুনিক উড়ন্ত কাঠবিড়ালির মতো তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে ভেসে যেতে পারত। এ কারণে প্রায় অক্ষত অবস্থায় পাওয়া নতুন জীবাশ্মটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাইক্রোরেপ্টররা কীভাবে গাছের ডালে চলাচল করত, কীভাবে তাদের শরীরের গঠন অভিযোজিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে পাখিদের উড্ডয়ন ক্ষমতা বিকাশে কী ধরনের বিবর্তনীয় ধাপ কাজ করেছে, সে সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

প্রাচীন পৃথিবীর রহস্য উদ্ঘাটনে এই আবিষ্কারকে গবেষকেরা একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি ডাইনোসর ও আধুনিক পাখির মধ্যকার বিবর্তনীয় সম্পর্ক নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed