বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই স্বাগতিক শহরগুলোর জন্য বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শকদের কারণে পর্যটন খাতের প্রসার, হোটেল ব্যবসায় চাঙ্গাভাব, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রত্যাশা থাকে। তবে এবারের বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে সেই প্রত্যাশা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশিত পর্যটক আগমন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে টিকিটের উচ্চ মূল্য, প্রত্যাশার তুলনায় কম হোটেল বুকিং এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্বকাপকেন্দ্রিক সম্ভাব্য আয় নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে সংশ্লিষ্টদের।
আন্তর্জাতিক দর্শকদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন বিদেশি দর্শকদের জন্য সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ভ্রমণকারীদের বিকল্প পরিকল্পনা ও জরুরি প্রস্তুতি রাখা উচিত। তাদের মতে, প্রশাসনের কিছু নীতি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এদিকে ভিসা প্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। পূর্বে কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য যে ভিসা বন্ড ব্যবস্থা চালু ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। বিশ্বকাপের টিকিটধারীদের ক্ষেত্রেও এ শর্ত তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে ভিসা অনুমোদনে বিলম্বের কারণে অনেক দর্শক নির্ধারিত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
দেশীয় দর্শকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে নয়। চাকরির বাজারে স্থবিরতা এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মানুষের অতিরিক্ত ব্যয়ের সক্ষমতা কমেছে। তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা ভ্রমণ ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বকাপ ঘিরে পর্যটন খাতে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি হোটেল শিল্পেও প্রতিফলিত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেল প্রত্যাশার তুলনায় কম বুকিং পেয়েছে। হোটেল ব্যবসায়ীরা এর জন্য ভিসাজনিত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতাকে দায়ী করছেন।
ফাইনাল ম্যাচের আয়োজক নিউইয়র্কে বুকিং প্রত্যাশার প্রায় ৬৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সিয়াটলসহ আরও কয়েকটি শহরেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও প্রত্যাশিত হারে পর্যটক আগ্রহ তৈরি হয়নি বলে জানা গেছে।
তবে কিছু স্থানীয় প্রশাসন এখনো আশাবাদী। তাদের বিশ্বাস, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুকিং বাড়বে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপের মতো আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু স্বাভাবিক পর্যায়ের বুকিং যথেষ্ট নয়; বরং প্রত্যাশা থাকে ব্যতিক্রমধর্মী পর্যটক উপস্থিতির।
আবাসন খাতের কিছু বড় প্রতিষ্ঠান অবশ্য ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তাদের ধারণা, শেষ মুহূর্তে বুকিংয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্বকাপ উপলক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শক ভ্রমণে অংশ নেবেন।
তবে আবাসন ব্যয়ের চিত্রও সাধারণ দর্শকদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ডালাস, ফিলাডেলফিয়া ও নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোতে ম্যাচ উপলক্ষে হোটেল ও স্বল্পমেয়াদি আবাসনের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে আবাসন ব্যয় কয়েক হাজার ডলার ছাড়িয়েছে।
বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও অধিকাংশ বুকিং এসেছে দেশীয় ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে। বিদেশি দর্শকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। অথচ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিদেশি পর্যটকেরাই সাধারণত বেশি ব্যয় করে থাকেন।
বিশ্বকাপের টিকিট মূল্য নিয়েও চলছে ব্যাপক বিতর্ক। সমর্থকদের সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, আগের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় এবার টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেশি। অনেক ফুটবলপ্রেমীর মতে, বর্তমান মূল্য সাধারণ দর্শকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
ফাইনাল ম্যাচের টিকিট পুনর্বিক্রয় বাজারে কয়েক হাজার ডলার থেকে শুরু করে কয়েক দশ হাজার ডলার পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। মূল্য নির্ধারণের এই পদ্ধতি নিয়ে তদন্তও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, দর্শকদের যেন অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত মূল্য দিতে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। লটারির মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে টিকিট বিতরণ এবং উন্মুক্ত স্থানে ফাইনাল ম্যাচ প্রদর্শনের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষও বিশ্বকাপের আবহ উপভোগ করতে পারেন।
অন্যদিকে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কয়েকটি শহরে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। নতুন গণপরিবহন ব্যবস্থা, সাইকেল নেটওয়ার্ক, পথচারীবান্ধব প্রকল্প এবং নগর উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এ ধরনের আয়োজন দীর্ঘমেয়াদে শহরের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কিছু প্রকল্পকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন আটককেন্দ্র ও কারাগার নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপকে ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়া, ব্যয়বহুল টিকিট, অনিশ্চিত ভ্রমণ পরিস্থিতি এবং প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল পর্যটন চাহিদা স্বাগতিক শহরগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ শেষে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।





Add comment