উচ্চ রক্তচাপ এখন বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত সাধারণ একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও বিষয়টি বুঝতে পারেন না। আবার অনেকে জানার পরও এটিকে গুরুত্ব দেন না। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়া, সময়মতো ওষুধ না খাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা অনিয়মের কারণে অনেক সময় হঠাৎ করেই রক্তচাপ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, তেল-চর্বিযুক্ত খাদ্য, ধূমপান, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং শারীরিক অনিয়ম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার বড় কারণ। এমনকি নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করার পরও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যেতে দেখা যায়।
বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয় তখন, যখন সিস্টোলিক বা উপরের রক্তচাপ ১৮০ মিলিমিটার বা তার বেশি হয় কিংবা ডায়াস্টোলিক বা নিচের রক্তচাপ ১২০ মিলিমিটার বা তার ওপরে উঠে যায়। এই অবস্থা শরীরের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ, এতে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, মস্তিষ্ক, চোখ ও রক্তনালিতে গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
চিন্তার বিষয় হলো, অনেক সময় এত বেশি রক্তচাপ থাকার পরও রোগীর শরীরে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা নাও যেতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে শরীর আগাম সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র মাথাব্যথা, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, প্রস্রাব লালচে হওয়া কিংবা শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। কারণ, এই অবস্থায় অনেক সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। সাধারণ উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার সঙ্গে জরুরি অবস্থার চিকিৎসার পার্থক্য রয়েছে। তখন রক্তচাপ কমানোর পদ্ধতি ও ব্যবহৃত ওষুধও ভিন্ন হতে পারে।
তবে যদি রোগীর মধ্যে কোনো সতর্ক লক্ষণ না থাকে এবং চিকিৎসক নিশ্চিত হন যে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে বাসায় থেকেই চিকিৎসা চালানো সম্ভব। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিশেষ শারীরিক কারণ থাকতে পারে। যেমন কিডনির সমস্যা, হরমোনজনিত জটিলতা, রক্তনালির সমস্যা অথবা হৃদ্যন্ত্রের জন্মগত ত্রুটি। বিশেষ করে কম বয়সে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে চিকিৎসকেরা সাধারণত এসব কারণ খুঁজে দেখার পরামর্শ দেন।
গর্ভাবস্থায় বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। এই সময়ে হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে গেলে মা ও গর্ভের শিশুর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মায়ের খিঁচুনিও দেখা দিতে পারে, যা জীবনহানির কারণ হতে পারে।
চিকিৎসকেরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিছু জরুরি করণীয় অনুসরণ করার পরামর্শ দেন। প্রথমেই দুই হাতেই রক্তচাপ মাপা উচিত। রোগীকে আতঙ্কিত না করে শান্ত রাখা জরুরি। নির্ধারিত ওষুধ সঠিকভাবে গ্রহণ করতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যদি বিপজ্জনক কোনো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে যেতে হবে।
একই সঙ্গে কিছু ভুল থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে নিজের ইচ্ছামতো অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। নতুন কোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেকেই ঘরোয়া উপায়ে তেঁতুলগোলা পানি বা নানা কিছু খেয়ে সময় নষ্ট করেন, যা কোনো উপকার করে না। বরং এতে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লক্ষণগুলোকে অবহেলা না করা। চিকিৎসক যদি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন, তাহলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসাই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।





Add comment