জাপানিদের শান্ত সম্পর্কের গোপন কৌশল

দাম্পত্য বা প্রেমের সম্পর্কে মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। দুইজন মানুষ একসঙ্গে থাকলে ভিন্ন মত, অভিমান কিংবা ভুল বোঝাবুঝি থাকতেই পারে। কিন্তু ছোট ছোট বিরোধ যখন ঘন ঘন তর্কে রূপ নেয়, তখন সম্পর্কের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হতে শুরু করে। অনেক সময় দীর্ঘদিনের অশান্তি বিচ্ছেদের কারণও হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে জাপানি দম্পতিরা নিজেদের শান্ত রাখতে এবং সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। জাপানি ভাষায় এই পদ্ধতির নাম ‘মা’।

শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলোর মতে, ‘মা’ মূলত এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি ছোট নীরব বিরতি নেওয়া হয়। এই বিরতি কেবল চুপ করে থাকা নয়, বরং নিজের আবেগকে গুছিয়ে নেওয়া এবং শান্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার একটি সচেতন প্রয়াস।

ধরুন, কোনো একটি বিষয়ে আপনি এবং আপনার সঙ্গীর মতের অমিল তৈরি হয়েছে। আলাপের একপর্যায়ে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করল। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অনেকে নিজের অবস্থান প্রমাণ করতে আরও জোরে তর্ক করতে থাকেন। কিন্তু ‘মা’ পদ্ধতিতে ঠিক সেই মুহূর্তে নিজেকে কিছুটা থামিয়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিছু সময়ের জন্য নীরব থাকা হয়।

এই নীরবতা অনেকের কাছে প্রথমে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কারণ হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে অনেক সময় অপর ব্যক্তি ভাবতে পারেন, তাঁকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু ‘মা’ পদ্ধতির মূল বিষয়ই হলো, এই বিরতিকে এমনভাবে নেওয়া যাতে তা সম্পর্কের মধ্যে চাপ না বাড়িয়ে বরং উত্তেজনা কমিয়ে আনে। এতে ধীরে ধীরে দুজনের মন ও শরীর শান্ত হতে শুরু করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাগের মাথায় মানুষ এমন অনেক কথা বলে ফেলেন, যা পরে নিজেকেই অনুশোচনায় ভোগায়। সেই কথাগুলো অপর মানুষের মনেও গভীর আঘাত তৈরি করতে পারে। তাই উত্তেজনার মুহূর্তে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কিছুটা সময় নেওয়া সম্পর্কের জন্য উপকারী।

এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বিরতির পর মানুষ নিজের অনুভূতি আরও নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রকাশ করতে পারে। তখন কণ্ঠের স্বরও তুলনামূলক শান্ত থাকে। ফলে অভিযোগ না করে নিজের কষ্টের জায়গাটা স্পষ্টভাবে বোঝানো সম্ভব হয়। একই সঙ্গে অপর পক্ষের অবস্থান বা যুক্তি নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।

অনেক সময় আমরা শুধু নিজের রাগ বা অভিমান নিয়েই ভাবি। কিন্তু নীরবতার সেই ছোট সময়টুকু মানুষকে ভাবতে শেখায় যে, অপর পক্ষের আচরণের পেছনেও হয়তো কোনো কারণ আছে। এই উপলব্ধি সম্পর্কের সংঘাত অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সব সময় তর্কে জেতার প্রয়োজন নেই। বরং পারস্পরিক সম্মান এবং ভালোবাসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন দুইজন মানুষ উত্তেজনার মাঝেও কিছু সময় শান্ত থাকার চেষ্টা করেন, তখন নীরবভাবেই একটি বার্তা পৌঁছে যায় যে তারা আসলে সম্পর্কটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তবে ‘মা’ পদ্ধতি চর্চা করতে গিয়ে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। শুধু হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেই হবে না। সেই নীরবতাকে অর্থবহ করে তুলতে হবে। যেন এমন মনে না হয় যে আপনি সঙ্গীকে এড়িয়ে যাচ্ছেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে দূরে সরে যাচ্ছেন।

এই সময় শরীরী ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। মুখে বিরক্তি বা ক্ষোভের ছাপ রাখা যাবে না। ভ্রু কুঁচকে থাকা কিংবা রাগ দেখানোর মতো আচরণ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। আবার নীরব থাকার সময় রাগে কোনো কিছু ছুড়ে ফেলা বা নেতিবাচক আচরণ করলেও এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়।

বরং এই বিরতির সময় ভালো কোনো স্মৃতি মনে করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন কোনো মুহূর্তের কথা ভাবা যেতে পারে, যখন দুজন মানুষ একসঙ্গে সুখী ছিলেন। এতে শরীর ও মন কিছুটা শিথিল হতে পারে। তখন মনে করিয়ে দেওয়া সহজ হয় যে যার সঙ্গে তর্ক চলছে, তিনিই আসলে সবচেয়ে কাছের মানুষ।

এই সময়টুকু কাজে লাগিয়ে ভেবে নেওয়া যায়, কীভাবে নিজের অনুভূতি আঘাত না দিয়ে প্রকাশ করা যায়। এরপর আবার কথা শুরু করার সময় কণ্ঠস্বর কোমল রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতে এই অভ্যাস কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে এটি সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। একসময় সঙ্গীও এই পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করবেন। ফলে ঝগড়া বা উত্তেজনা সামলানো সহজ হবে এবং দুজনের বোঝাপড়াও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed