যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের মধ্যে ডিপোর্টেশন আতঙ্ক বাড়তে থাকায় তারা ক্রমেই প্রতারণার সহজ শিকার হয়ে উঠছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে অন্তত ছয়জন অভিবাসী ১,৩০০ থেকে ১১,০০০ ডলার পর্যন্ত অর্থ হারিয়েছেন। প্রতারকরা নিজেদের আইনজীবী বা ল’ ফার্মের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে কখনো ভুয়া ভিডিও শুনানি আয়োজন করেছে, আবার কখনো নকল নথি দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করেছে।
নিউইয়র্কে বসবাসকারী এক ভেনেজুয়েলান অভিবাসী, যিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সেখানে আছেন এবং একটি ছোট ব্যবসা পরিচালনা করেন, সম্প্রতি এমনই এক প্রতারণার শিকার হন। পরিবারের এক সদস্যকে অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে মুক্ত করতে গিয়ে তিনি প্রথমে স্থানীয় একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হলেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ল’ ফার্মের নামে খোলা অ্যাকাউন্টে যোগাযোগ করেন। সেখানে নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ১৫ দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন।
পরবর্তী সময়ে একাধিক ভিডিও কলে ওই ব্যক্তি মামলার অগ্রগতি দেখান এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থার আদলে তৈরি নথি পাঠান। ভিডিও কলে অফিস, ডিগ্রি ও আমেরিকান পতাকা দেখিয়ে একটি বাস্তবসম্মত পরিবেশ তৈরি করা হয়। এতে তিনি নিশ্চিত হন যে সবকিছু সঠিকভাবেই এগোচ্ছে। কিন্তু ধাপে ধাপে বিভিন্ন খাতে অর্থ নেওয়া শুরু হয়। মামলার ফি, ফর্ম পূরণ, জামানত, ভ্রমণ খরচসহ মোট প্রায় ৫,৪৮৮ ডলার তিনি পরিশোধ করেন।
পরবর্তীতে যখন অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়, তখন সন্দেহ তৈরি হয়। বিশেষ করে এমন একটি খাতে টাকা চাওয়া হয় যার কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। তখনই তিনি বুঝতে পারেন এটি একটি প্রতারণা, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এ ধরনের প্রতারণা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। অভিবাসন সংক্রান্ত গ্রেপ্তার ও আটক বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া ভয় এবং অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতারকরা বাস্তব আইনজীবীদের নাম ব্যবহার করছে অথবা সম্পূর্ণ ভুয়া পরিচয় তৈরি করছে।
আরেকজন পেরুভিয়ান আশ্রয়প্রার্থী একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন, যেখানে তাকে একটি ভুয়া ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। একই ধাঁচের অভিযোগ এসেছে আরও অনেকের কাছ থেকে, যাদের অধিকাংশই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছেন।
একাধিক অভিবাসী জানিয়েছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে দ্রুত সমাধানের আশায় যোগাযোগ করেন। এরপর ভিডিও কলে শুনানি, নকল সরকারি নথি এবং দ্রুত ফল পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকা পাঠানো হয়েছে জেলি, ভেনমো বা পেপালের মতো প্ল্যাটফর্মে, যেখানে ব্যাংকের মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪১ শতাংশ অভিবাসী নিজেদের বা পরিবারের সদস্যদের আটক বা বহিষ্কারের আশঙ্কায় ভুগছেন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই ভয়ের কারণে অনেকেই বাইরে যাওয়া, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা কাজ করতেও দ্বিধা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভয়ই প্রতারকদের প্রধান অস্ত্র।
প্রতারণার শিকার হওয়া অনেকেই অভিযোগ করতে সাহস পান না। তাদের আশঙ্কা, অভিযোগ করলে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে অধিকাংশ ঘটনাই অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, আইনজীবী নির্বাচন করার আগে অবশ্যই তার লাইসেন্স যাচাই করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তড়িঘড়ি করে অর্থ পাঠানো উচিত নয় এবং সরাসরি সাক্ষাৎ না করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে সেটি সন্দেহের কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিবাসন প্রতারণার বিরুদ্ধে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যেখানে ১ লাখ ডলারের বেশি অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধ করা কঠিন। তাই অভিবাসীদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।





Add comment