স্পেনে অবৈধভাবে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে বৈধতার আওতায় আনার উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির সরকার এমন একটি নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যার মাধ্যমে পাঁচ লাখেরও বেশি অনথিভুক্ত অভিবাসী বৈধ বসবাস ও কাজের সুযোগ পেতে পারেন। অভিবাসন নীতিতে এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, আটক এবং বহিষ্কারের কার্যক্রম চলছে।
কলম্বিয়া থেকে আসা ৩৪ বছর বয়সী এক অভিবাসী জানান, তাঁর পরিবারের মূল পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার। তবে যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ায় তারা শেষ পর্যন্ত ইউরোপের পথ বেছে নেন। বর্তমানে স্পেনে বৈধতা পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি মনে করেন, ভাগ্য তাদের জন্য ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছিল।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা সেখানে গেলে হয়তো ইতোমধ্যে বহিষ্কারের মুখোমুখি হতেন। এখন স্পেনে নতুন জীবন গড়ে তোলার সুযোগ পেয়ে তিনি স্বস্তি অনুভব করছেন।
স্পেন সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আবেদন অনুমোদিত হলে প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীরা এক বছরের জন্য বসবাস ও কাজের অনুমতি পাবেন। পরবর্তীতে কর্মসংস্থানের প্রমাণ দেখিয়ে সেই অনুমতি নবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বৈধতার মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
সরকার জানুয়ারিতে কর্মসূচিটি ঘোষণা করে। আবেদন গ্রহণ শুরু হয় ১৬ এপ্রিল। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ৪৩ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। এক মাসের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯৬-এ। আবেদন গ্রহণের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ জুন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় তিন মাস সময় লাগতে পারে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী এই উদ্যোগকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, যেসব অভিবাসী এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন, তারা ইতোমধ্যেই স্পেনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন।
কলম্বিয়া থেকে আসা ওই পরিবারের সদস্যরা দুই বছর ধরে বার্সেলোনায় বসবাস করছেন। আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। পরিবারে রয়েছেন স্বামী, দুই সন্তান এবং বাবা। সবাই এখন বৈধতার জন্য আবেদন করেছেন।
পরিবারটির দাবি, ২০২৪ সালে তারা অপরাধী চক্রের হুমকি ও চাঁদাবাজির মুখে নিরাপত্তার খোঁজে নিজ দেশ ছেড়েছিলেন। পেশায় শিক্ষক হলেও স্পেনে এসে তিনি গুদামকর্মী ও ব্যক্তিগত শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠিন। নিজের বাড়ি, ব্যবসা, চাকরি, সহকর্মী ও স্বজনদের ছেড়ে আসতে অসাধারণ সাহস লাগে। তাঁর ভাষায়, তিনি মাত্র ১০ কেজির একটি স্যুটকেসে নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তবে তিনি মনে করেন, স্পেন অভিবাসীদের স্বাগত জানানো একটি দেশ।
অন্যদিকে সেনেগালি বংশোদ্ভূত আরেক পরিবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। পরিবারের তিন সন্তান স্পেনে জন্ম নেওয়ায় তারা ইতোমধ্যেই বৈধ মর্যাদা পেয়েছে। তবে পরিবারের পুরুষ সদস্য এখনো বৈধ নন এবং নতুন কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের একজন হতে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, বৈধ কাগজপত্র পেলে তিনি নিয়মিত চাকরি করতে পারবেন এবং পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ভাগ করে নিতে সক্ষম হবেন। গত দুই বছর ধরে তিনি কেবল অনিয়মিতভাবে বন্ধুর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেছেন, তাও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই।
পরিবারের ব্যয়ভার বর্তমানে বহন করছেন তাঁর সঙ্গী। তিনি একটি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। বৈধতা পাওয়ার পর তাঁর আশা, সঙ্গীও একই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাবেন এবং সন্তানদের দেখভালের দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে পারবেন।
স্পেনে বৈধতার জন্য আবেদনকারীদের বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে। পাসপোর্টের পাশাপাশি তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা ১ জানুয়ারি ২০২৬ সালের আগে স্পেনে অবস্থান করছিলেন এবং আবেদনকালে অন্তত পাঁচ মাস ধারাবাহিকভাবে দেশে ছিলেন। নিবন্ধন সনদ, চিকিৎসা নথি বা সন্তানদের স্কুলে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে এসব প্রমাণ উপস্থাপন করা যাচ্ছে।
এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে যে দেশগুলোতে বসবাস করেছেন, সেসব দেশের পরিষ্কার অপরাধমূলক রেকর্ডও জমা দিতে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক সেবা সংস্থার দেওয়া বিশেষ সনদও প্রয়োজন হচ্ছে, যা আবেদনকারীর আর্থিক বা সামাজিক দুর্বল অবস্থার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এটি স্পেনের ইতিহাসে প্রথম নয়। প্রায় দুই দশক আগে দেশটি একই ধরনের বৃহৎ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিল। অভিবাসনবিষয়ক আইনজীবীদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সময়ে সময়েই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনসংখ্যার বার্ধক্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্পেনের জন্য এই পদক্ষেপ অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৬৪ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৬ বছরের কম বয়সী মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে নতুন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অবদান রাখতে পারবে।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ডানপন্থী দলগুলো কর্মসূচিটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে সমালোচনা করছে। তাদের অভিযোগ, ইতোমধ্যেই চাপের মুখে থাকা জনসেবাগুলো আরও সংকটে পড়তে পারে। এমনকি কিছু রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করেছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যদিও বৈধতা পাওয়া অভিবাসীরা ভোটাধিকার পাবেন না।
সব বিতর্কের মধ্যেও হাজারো অভিবাসী পরিবারের জন্য এই উদ্যোগ নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তারা শুধু বসবাস নয়, স্পেনে স্থায়ীভাবে শিকড় গেড়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।





Add comment