ইন্টারভিউয়ে জিততে ৭-৩৮-৫৫ কৌশল জানুন

চাকরির সাক্ষাৎকারে অনেক প্রার্থীই একটি সাধারণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়ার পরও, সঠিকভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতি কেন ঘটে, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে সামনে আসে একটি সুপরিচিত মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা, যা ৭-৩৮-৫৫ নিয়ম নামে পরিচিত।

এই তত্ত্বটি প্রণয়ন করেন একজন খ্যাতিমান মনোবিজ্ঞানী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৬৭ সালে যোগাযোগ ও আবেগ প্রকাশ নিয়ে গবেষণার সময় তিনি এই ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তার গবেষণায় উঠে আসে, একজন মানুষ কী বলছেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কীভাবে বলছেন এবং তার শরীরী ভাষা কেমন।

এই নিয়ম অনুযায়ী, যোগাযোগের ক্ষেত্রে শব্দের ভূমিকা মাত্র ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, আপনি কী বলছেন, সেটি মোট প্রভাবের একটি ছোট অংশ। এর বিপরীতে ৩৮ শতাংশ নির্ভর করে আপনার কণ্ঠস্বরের ওপর, যেমন বলার ভঙ্গি, স্বরের ওঠানামা ও দৃঢ়তা। সবচেয়ে বড় অংশ, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ নির্ভর করে আপনার শরীরী ভাষার ওপর, যার মধ্যে পড়ে আপনার অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি এবং সামগ্রিক উপস্থিতি।

অর্থাৎ, মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কথার চেয়ে আচরণ ও উপস্থাপনাই বেশি প্রভাব বিস্তার করে। এই কারণেই অনেক সময় কথার সঙ্গে আচরণের অমিল দেখা গেলে মানুষ আচরণকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে, কেউ যদি বলে ‘আমি ভালো আছি’, কিন্তু তার মুখভঙ্গি বিষণ্ন থাকে এবং কণ্ঠস্বর দুর্বল শোনায়, তখন শ্রোতা সাধারণত কথার চেয়ে তার অভিব্যক্তিকেই বেশি বিশ্বাস করে। ঠিক একই বিষয় প্রতিফলিত হয় চাকরির সাক্ষাৎকারেও।

অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীরা সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন, কিন্তু তাদের শরীরী ভাষা আত্মবিশ্বাসী না হওয়ায় সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীরা আশ্বস্ত হতে পারেন না। ফলে তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সাক্ষাৎকারে এই নিয়মের প্রয়োগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, অনেক প্রার্থী ভালো উত্তর দিলেও তা উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। তারা চোখে চোখ রেখে কথা বলেন না, কণ্ঠস্বর স্পষ্ট বা দৃঢ় হয় না, কিংবা তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যায়। এর ফলে সাক্ষাৎকার বোর্ড মনে করতে পারে যে প্রার্থী কাজের জন্য উপযুক্ত নন।

এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, চাকরির সাক্ষাৎকারে সফলতা নির্ভর করে আপনি কী বলছেন তার ওপর কম, বরং আপনি কীভাবে বলছেন তার ওপর বেশি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অনেকেই সাক্ষাৎকারের জন্য উত্তর মুখস্থ করেন, কিন্তু সেটিকে আত্মস্থ করেন না। ফলে তাদের উপস্থাপনায় স্বাভাবিকতা থাকে না, যা সহজেই বোঝা যায়। কণ্ঠস্বর, শরীরী ভাষা এবং উপস্থিতিতে সেই আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে না। এর ফলেই ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও তারা কাঙ্ক্ষিত ফল থেকে বঞ্চিত হন।

এই বাস্তবতায় ৭-৩৮-৫৫ নিয়মকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এজন্য কিছু কৌশল অনুসরণ করা যেতে পারে।

প্রথমত, নিজের প্রস্তুতি যাচাই করতে ভিডিও রেকর্ডিং একটি কার্যকর পদ্ধতি। এতে নিজের কথা বলার ধরন, চোখের যোগাযোগ এবং ভঙ্গি বিশ্লেষণ করা যায়। বারবার পর্যবেক্ষণ ও সংশোধনের মাধ্যমে নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সোজা হয়ে বসা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা এবং স্বাভাবিক আচরণ একজন প্রার্থীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে তা ভদ্রভাবে স্বীকার করাও একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

তৃতীয়ত, কণ্ঠস্বরের প্রতি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। খুব দ্রুত বা খুব ধীরে না বলে, স্পষ্ট ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলা উচিত। কণ্ঠস্বর যেন স্থির ও আত্মবিশ্বাসী হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, শরীরী ভাষা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অযথা হাত-পা নাড়ানো বা অস্থিরতা প্রকাশ করা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বরং সংযত ও স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখা উচিত।

সবশেষে, বাস্তব পরিস্থিতির মতো করে অনুশীলন করা গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধুদের সঙ্গে মক ইন্টারভিউ দেওয়া কিংবা প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেকে প্রস্তুত করলে বাস্তব সাক্ষাৎকারে পারফরম্যান্স উন্নত করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, চাকরির সাক্ষাৎকারে সফলতার জন্য শুধু জ্ঞান বা প্রস্তুতি নয়, বরং সঠিক উপস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ৭-৩৮-৫৫ নিয়ম সেই উপস্থাপনাকে আরও কার্যকরভাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed