হাঁটতে গিয়ে অনেকেরই মাঝে মাঝে পা ভারী মনে হয়। আবার কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই পা ফুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও অস্বাভাবিক নয়। এমন অবস্থায় জুতা বা মোজা পরতে কষ্ট হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করে। এই পা ফোলার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরের কোনো অংশে তরল জমে ফুলে ওঠাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ইডেমা বলা হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের পানি জমতে পারে, তবে মাধ্যাকর্ষণের কারণে নিচের অংশে, বিশেষ করে পায়ে, এটি বেশি দেখা যায়। পা ফোলার ক্ষেত্রে প্রথমেই লক্ষ্য করা জরুরি, এটি এক পায়ে হচ্ছে নাকি দুই পায়েই।
দুই পা ফোলার কারণ
যদি দুই পা একসঙ্গে ফুলে যায়, তাহলে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রথমত, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পা ফুলতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, কিছু ব্যথানাশক যেমন অ্যাসপিরিন বা আইব্রপ্রফেন, স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল এ ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এমন ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ পরিবর্তন করা যেতে পারে।
অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে পা ফোলা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। এটি বেশিরভাগ সময় স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখা যায়।
এ ছাড়া পায়ের শিরার ভালভ দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্ত সঠিকভাবে উপরের দিকে ফেরত যেতে পারে না, ফলে পায়ে জমে ফোলাভাব তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। যাঁদের ওজন বেশি, তাঁদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তবে সব ক্ষেত্রেই বিষয়টি এতটা সাধারণ নয়। অনেক সময় পা ফোলা গুরুতর রোগের লক্ষণও হতে পারে। যেমন হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা, কিডনি বা লিভারের সমস্যা, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি কিংবা অপুষ্টি। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত অন্যান্য উপসর্গও দেখা যায়, যেমন শ্বাসকষ্ট, মুখ বা পেট ফোলা, জন্ডিস, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা গলার স্বরে পরিবর্তন।
এক পা ফোলার কারণ
যদি শুধুমাত্র একটি পা ফুলে যায়, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধাকে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস বলা হয়। এ অবস্থায় ধমনির মাধ্যমে রক্ত পায়ে পৌঁছালেও শিরা দিয়ে ঠিকমতো ফিরে যেতে পারে না, ফলে পা ফুলে যায়। হঠাৎ ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং এক পা ফুলে ওঠা এ রোগের প্রধান লক্ষণ। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ জমাট বাঁধা রক্তপিণ্ড হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসে পৌঁছে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘ সময় বিছানায় শুয়ে থাকা, ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া, পায়ে আঘাত পাওয়া বা দীর্ঘ সময় ভ্রমণ করার ফলে এই ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া লসিকা নালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে লিম্ফ ইডেমা হতে পারে, যা পা ফুলে যাওয়ার আরেকটি কারণ। ত্বকের নিচে প্রদাহ বা জীবাণুর সংক্রমণজনিত সেলুলাইটিসও পা ফোলার জন্য দায়ী হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে হাঁটুর হাড়ক্ষয়জনিত সমস্যার সঙ্গেও পা ফোলার সম্পর্ক দেখা যায়।
করণীয়
পা ফোলার সমস্যা সাময়িকভাবে কমাতে কিছু নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে। লবণ ও লবণযুক্ত খাবার কম খাওয়া উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ঘুমানোর সময় পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে কিছুটা উঁচু করে রাখলেও উপকার পাওয়া যায়।
তবে হঠাৎ পা ফুলে গেলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এটি যেমন সাময়িক কারণেও হতে পারে, তেমনি গুরুতর রোগের পূর্বলক্ষণও হতে পারে। তাই যথাসময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক কারণ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি।





Add comment