বসা থেকে উঠলেই মাথা ঘোরে কেন?

অনেকেই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন যে বিছানা, চেয়ার বা সোফা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর পর কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথা ঝিমঝিম করে, চোখে অন্ধকার নেমে আসে কিংবা চারপাশ ঘোরার মতো অনুভূতি হয়। কারও ক্ষেত্রে নামাজের সেজদা থেকে উঠলে বা গভীর রাতে ঘুম ভেঙে হঠাৎ দাঁড়ালে একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণ মনে হলেও এই অবস্থার পেছনে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া জড়িত থাকে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ সমস্যাকে বলা হয় ‘অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন’। অর্থাৎ শরীরের অবস্থান পরিবর্তনের ফলে হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া। এটি অনেক সময় সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী হলেও শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

মানুষ যখন শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে দ্রুত দাঁড়িয়ে যায়, তখন অভিকর্ষজ বলের কারণে শরীরের রক্ত নিচের অংশে জমা হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে অল্প সময়ের জন্য মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কিছুটা কমে যেতে পারে। সাধারণ অবস্থায় শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত কাজ করে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়। হৃদস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে এবং রক্তনালিগুলো সংকুচিত করে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। কিন্তু কোনো কারণে এই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা কিংবা চোখে ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো পানিশূন্যতা। শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে রক্তের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তচাপও নিচে নেমে আসে। ফলে হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর সময় মাথা ঘোরার ঝুঁকি বাড়ে।

এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়াও এ সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে অক্সিজেন পরিবহনের সক্ষমতা কমে যায়, যা মাথা ঘোরা বা দুর্বলতার অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়।

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা মানসিক সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ দ্রুত রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে রোগীরা হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর সময় অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন।

স্নায়বিক কিছু রোগও এর জন্য দায়ী হতে পারে। পারকিনসন রোগ কিংবা মাল্টিপল সিস্টেম অ্যাট্রোফির মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্নায়ুতন্ত্র রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। ফলে তাদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

শুধু তা-ই নয়, শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কানের ভেতরের অংশে কোনো সমস্যা থাকলেও মাথা ঘোরার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের উপসর্গ থাকলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে কিছু সহজ অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমত, শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে কখনোই হঠাৎ উঠে দাঁড়ানো উচিত নয়। ধীরে ধীরে শরীরকে প্রস্তুত করে দাঁড়ালে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। বিছানা থেকে ওঠার আগে কয়েক মিনিট পা ঝুলিয়ে বসে থাকা উপকারী হতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরকে সব সময় হাইড্রেটেড রাখলে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরে লবণ ও পানির ভারসাম্য বজায় রাখাও প্রয়োজন।

দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হলে মাঝেমধ্যে পায়ের পেশি সচল রাখা ভালো। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে ওঠানামা করলে রক্ত সহজে ওপরের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে একবারে অতিরিক্ত খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েকবার খাবার গ্রহণ করাও উপকারী।

তবে মাথা ঘোরার সঙ্গে যদি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা, ঝাপসা দেখা বা নিয়মিত একই সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে রক্তচাপ পরীক্ষা ও স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন মূল্যায়ন করানো উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা এবং দৈনন্দিন জীবনের কিছু ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমেই অধিকাংশ মানুষ এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। তাই হঠাৎ মাথা ঘোরার বিষয়টিকে অবহেলা না করে এর কারণ জানা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed