একটানা পানি পান, লুকিয়ে আছে বিপদ

পানি মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যক একটি উপাদান। সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান করার বিকল্প নেই। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি পান করাও যে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে, সে বিষয়ে অনেকেই সচেতন নন। সাধারণত ডায়াবেটিস বা কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে অতিরিক্ত তৃষ্ণা দেখা দিতে পারে। কিন্তু কোনো শারীরিক কারণ ছাড়াই যখন একজন ব্যক্তি বারবার এবং অস্বাভাবিক পরিমাণে পানি পান করতে থাকেন, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় ‘সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া’।

সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া মূলত মানসিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট একটি জটিল অবস্থা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে পানির ঘাটতি না থাকলেও মস্তিষ্ক তাকে ঘন ঘন পানি পান করার সংকেত দেয়। এটি সাধারণ তৃষ্ণা নয়, বরং বাধ্যতামূলক আচরণের একটি রূপ, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘কম্পালসিভ বিহেভিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজঅর্ডার কিংবা তীব্র উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা এ ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।

চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অতিরিক্ত পানি পানের ফলে শরীরে সৃষ্টি হওয়া ‘ওয়াটার ইনটক্সিকেশন’ বা পানি বিষক্রিয়া। মানবদেহে রক্তের মধ্যে সোডিয়ামের একটি নির্দিষ্ট মাত্রা বজায় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উপাদান স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু কেউ যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান করেন, তখন রক্তে সোডিয়ামের ঘনত্ব দ্রুত কমে যেতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় ‘হাইপোনাট্রেমিয়া’।

রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন কোষ পানি শোষণ করে ফুলে উঠতে থাকে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের কোষগুলো আক্রান্ত হলে সেরেব্রাল ইডেমা বা মস্তিষ্কে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। এতে মস্তিষ্কের ভেতরে চাপ বৃদ্ধি পায়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়ার ফলে শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হলে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা বমির সমস্যায় ভুগতে পারেন। অনেক সময় সারাক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন অনুভূতি, মানসিক বিভ্রান্তি কিংবা মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়। মাংসপেশিতে খিঁচুনি, দুর্বলতা এবং অস্বাভাবিক হারে প্রস্রাব হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। রোগের অবস্থা গুরুতর হলে রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন এবং জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৫ থেকে ২০ শতাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে এই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও অতিরিক্ত তৃষ্ণা অনুভূত হতে পারে। আবার ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে বা ভুল স্বাস্থ্যধারণার কারণে যারা অস্বাভাবিক পরিমাণে পানি পান করেন, তারাও এই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।

এই সমস্যার চিকিৎসায় শুধু পানি পান কমিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে থাকা মানসিক কারণ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তে ইলেকট্রোলাইট ও সোডিয়ামের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

আচরণগত থেরাপি বা কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত পানি পান করার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সচেতনতা, চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিমিতিবোধ গুরুত্বপূর্ণ। পানি যতই উপকারী হোক না কেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পিপাসা না থাকা সত্ত্বেও বারবার পানি পান করার অভ্যাস থাকলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed