ভূমিকম্পেও অটুট গিজার রহস্যময় পিরামিড

হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা কিছু স্থাপনা এখনো আধুনিক বিজ্ঞানকে বিস্মিত করে। মিসরের গিজার গ্রেট পিরামিড সেই বিস্ময়ের অন্যতম বড় উদাহরণ। প্রায় ৪ হাজার ৬০০ বছর আগে নির্মিত এই স্থাপনা সময়ের সঙ্গে অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এখনো অটুট রয়েছে। বিশেষ করে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পরও পিরামিডটির মূল কাঠামো অক্ষত থাকায় নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। সম্প্রতি গবেষকেরা এমন কিছু প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেয়েছেন, যা এই প্রাচীন স্থাপনাকে ভূমিকম্পের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে সক্ষম। আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত বহু ভবনও এমন কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ গিজার গ্রেট পিরামিড অতীতের একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্পেও প্রায় অক্ষত থেকেছে। পিরামিডের ভেতরের কিংবা বাইরের অংশে বড় ধরনের ভাঙন বা কাঠামোগত ধসের কোনো উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মিসরের ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিকসের গবেষকেরা বলছেন, এটি কেবল স্থাপত্যের সৌন্দর্য নয়, বরং অত্যন্ত নিখুঁত প্রকৌশল পরিকল্পনার ফল। তাঁদের ধারণা, পিরামিড নির্মাণে প্রাচীন মিসরীয়রা এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, যা আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধী নকশার সঙ্গেও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

গবেষকদের মতে, পিরামিড নির্মাণের জন্য প্রথমেই বেছে নেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত শক্ত চুনাপাথরের প্রাকৃতিক ভিত্তি বা বেডরক। এই ভিত্তি পুরো কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এর পাশাপাশি পিরামিডের সুষম জ্যামিতিক নকশা ও ত্রিভুজাকৃতির গঠনও ভূমিকম্পের শক্তি সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

গবেষণায় আরও জানা গেছে, পিরামিডের ভেতরে বিশেষ কিছু ফাঁকা কক্ষ বা ক্যাভিটি রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে কিংস চেম্বারের ওপরে তৈরি করা হয় কয়েকটি চাপ উপশমকারী ফাঁকা স্থান। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অংশগুলো মূল সমাধিকক্ষের ওপর সরাসরি চাপ কমিয়ে দেয় এবং কম্পনের শক্তিকে ভেঙে ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভূমিকম্পের সময় মূল কক্ষ ক্ষতির মুখে পড়ে না।

এই গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা পিরামিডের বিভিন্ন অংশে কম্পন বিশ্লেষণ করেন। পিরামিডের ভেতরের কক্ষ, পাথরের ব্লক এবং আশপাশের মাটিসহ মোট ৩৭টি আলাদা স্থানে কম্পনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পিরামিডের ভেতরে কম্পনের ফ্রিকোয়েন্সি ছিল প্রায় ২ দশমিক ০ থেকে ২ দশমিক ৬ হার্টজ। অর্থাৎ কম্পনের শক্তি পুরো কাঠামোতে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে পিরামিডের চারপাশের মাটির কম্পনের ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া যায় মাত্র ০ দশমিক ৬ হার্টজ। এই পার্থক্যই পিরামিডকে ভূমিকম্প প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। কারণ, কোনো ভবনের নিজস্ব কম্পাঙ্ক যদি মাটির কম্পাঙ্কের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে ভূমিকম্পের সময় সেই ভবনের ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু গিজার পিরামিডের কম্পনের ধরন মাটির তুলনায় আলাদা হওয়ায় ভূমিকম্পের শক্তি সরাসরি কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।

গবেষকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেছেন। ভূকম্পনের তরঙ্গ পিরামিডের ওপরের দিকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার তীব্রতা বাড়তে থাকে এবং কিংস চেম্বারে গিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ওই কক্ষের ওপরে থাকা পাঁচটি ফাঁকা ঘরে পৌঁছানোর পর কম্পনের তীব্রতা হঠাৎ কমে যায়। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এই ফাঁকা স্থানগুলো মূলত ভূমিকম্পের চাপ কমানোর জন্যই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রাচীন মিসরীয়দের এই প্রকৌশল জ্ঞান আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই কীভাবে এত উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার বছর আগের এই নির্মাণশৈলী আজও প্রকৌশলবিদ ও বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed