মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু মূল্যবান ধাতুর সন্ধান মিলেছে। তবে হাজার বছরের পথচলায় যে ধাতুটি মানুষের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, মূল্যবান ও কাঙ্ক্ষিত হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে, সেটি হলো সোনা। এর সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা যেমন মানুষকে মুগ্ধ করে, তেমনি সময়ের পরীক্ষায় অপরিবর্তিত থাকার ক্ষমতাও এটিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। লোহা, তামা বা অন্যান্য অনেক ধাতু বাতাস ও পরিবেশের প্রভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং মরিচা ধরে। কিন্তু খাঁটি সোনার ক্ষেত্রে সেই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। শত শত বছর নয়, হাজার বছর পরও খাঁটি সোনার গয়না বা বস্তু প্রায় একই রকম উজ্জ্বল ও অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারে।
বিজ্ঞানের ভাষায় এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘কেমিক্যাল নোবিলিটি’। অর্থাৎ সোনা এমন একটি ধাতু, যা বাতাসে থাকা অক্সিজেনের সঙ্গে খুব সহজে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না। পৃথিবীতে বিদ্যমান ধাতুগুলোর মধ্যে সোনা সবচেয়ে বেশি ‘নোবেল’ বা অভিজাত ধাতুর মর্যাদা পেয়ে থাকে। ফলে সাধারণ পরিবেশে এটি মরিচা ধরা বা অক্সিডেশনের মতো প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
সম্প্রতি এ রহস্য আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন দুই গবেষক বিশ্বাস ও মন্টেমো। তাঁদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স-এ। গবেষণায় তাঁরা সোনার মরিচা-প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের পেছনের পারমাণবিক গঠন সম্পর্কে নতুন ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।
গবেষকদের কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশনে দেখা গেছে, সোনার উপরিভাগের পরমাণুগুলো অত্যন্ত ঘন এবং বিশেষ ধরনের জ্যামিতিক বিন্যাসে সাজানো থাকে। এই বিন্যাস এতটাই সুনির্দিষ্ট ও ঘন যে বাতাসে থাকা অক্সিজেনের অণুগুলো সেখানে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা খুঁজে পায় না। ফলে অক্সিজেন সোনার পরমাণুর ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় অক্সিডেশন বা মরিচা ধরার প্রক্রিয়া শুরুই হতে পারে না।
রসায়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়ায় অক্সিজেন অ্যাকটিভেশন একটি অপরিহার্য ধাপ। উদাহরণস্বরূপ, বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইডকে কার্বন ডাই-অক্সাইডে রূপান্তর করতে অত্যন্ত সক্রিয় অক্সিজেন পরমাণুর প্রয়োজন হয়। এজন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধাতুর উপরিভাগ ব্যবহার করে অক্সিজেন অণুকে ভেঙে আলাদা পরমাণুতে পরিণত করেন। দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকদের আগ্রহ ছিল সোনাকে অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়ে। কারণ, অন্যান্য ধাতু অনুঘটক হিসেবে কাজ করার সময় নিজেরাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, অথচ সোনা সেই ক্ষয়ের শিকার হয় না।
তবে ১৯৮০-এর দশকে গবেষকেরা একটি বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কার করেন। সাধারণ আকারের সোনা যেখানে রাসায়নিকভাবে প্রায় নিষ্ক্রিয়, সেখানে সোনার ন্যানোকণা অক্সিজেন অণু ভাঙার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—যে ধাতু নিজেই অক্সিজেনকে প্রতিহত করে, তার ক্ষুদ্র কণাগুলো কীভাবে অক্সিডেশন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে?
নতুন গবেষণায় সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। গবেষকেরা সোনার ন্যানোস্কেল পৃষ্ঠে অক্সিজেনের আচরণ বিশ্লেষণ করে দুটি ভিন্ন ধরনের পারমাণবিক গঠন পরীক্ষা করেন। একটিতে পরমাণুগুলো ঘন হেক্সাগোনাল বা ষড়্ভুজাকার বিন্যাসে সাজানো ছিল, অন্যটিতে তুলনামূলকভাবে ঢিলেঢালা স্কয়ার বা চারকোনা বিন্যাসে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, ঘন ষড়্ভুজাকার বিন্যাসে অক্সিজেন অণুগুলো সহজে ভাঙতে পারে না। ফলে সাধারণ সোনার মতোই এটি অক্সিডেশন প্রতিরোধ করে। বিপরীতে, চারকোনা ও তুলনামূলক আলগা বিন্যাসে অক্সিজেন অণুগুলো দ্রুত ভেঙে পৃথক পরমাণুতে রূপ নেয় এবং রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, ঘন হেক্সাগোনাল কাঠামোর তুলনায় আলগা স্কয়ার বিন্যাসে অক্সিজেন ভাঙার হার কয়েক শ কোটি থেকে লাখ কোটি গুণ বেশি দ্রুত হতে পারে। এই তথ্যই ব্যাখ্যা করে কেন সোনার ন্যানোকণাগুলো সাধারণ সোনার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ প্রদর্শন করে।
অতি ক্ষুদ্র সোনার কণাগুলোর ক্ষেত্রে বড় সোনার মতো নিখুঁত ও ঘন ষড়্ভুজাকার কাঠামো তৈরি হয় না। ফলে তাদের পৃষ্ঠে থাকা অপেক্ষাকৃত আলগা অংশগুলো সহজেই অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে এবং দ্রুত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। অন্যদিকে বড় আকারের খাঁটি সোনার পৃষ্ঠ এতটাই সুরক্ষিত ও ঘনবদ্ধ থাকে যে অক্সিজেন সেখানে কার্যত প্রবেশের সুযোগ পায় না।
এই গবেষণা শুধু সোনার মরিচা না ধরার রহস্যই উন্মোচন করেনি, ভবিষ্যতে উন্নত অনুঘটক প্রযুক্তি ও নতুন শিল্পপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।





Add comment