ফুটবল বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ এবার পৃথিবীর গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে মহাকাশে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নাসার নভোচারীরা বলটি নিয়ে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা শূন্য অভিকর্ষ পরিবেশে বিশেষ বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেছেন। এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল ফুটবলের গতিবিদ্যা, ভারসাম্য এবং বলের উড়ন্ত অবস্থার আচরণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইওন্ডা বল ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীরা ২০১৯ সালে পরিচালিত একটি গবেষণার আধুনিক সংস্করণ পুনরায় সম্পন্ন করেছেন। গবেষণাটির উদ্দেশ্য ছিল ফুটবলের ভরকেন্দ্র ও ভারসাম্য কীভাবে বাতাসে বলের চলাচলকে প্রভাবিত করে, তা আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা।
ফুটবল মাঠে একটি বলের গতিপথ, গতি এবং বাতাসে ভেসে থাকার ধরন অনেকটাই নির্ভর করে তার ভরকেন্দ্রের নিখুঁত অবস্থানের ওপর। যদি বলের ভরকেন্দ্র সামান্যও সরে যায়, তাহলে শট নেওয়ার পর সেটি অস্বাভাবিকভাবে দিক পরিবর্তন করতে পারে কিংবা বাতাসে কাঁপতে পারে। ফলে খেলোয়াড়দের জন্য বল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে ওঠে এবং ম্যাচের ফলাফলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মহাকাশে পরিচালিত পরীক্ষাগুলোতে নভোচারীরা বলটির নিখুঁত ভারসাম্য ও সম্ভাব্য ভারসাম্যগত ত্রুটির মধ্যে পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করেছেন। একই সঙ্গে বলের অভ্যন্তরে স্থাপন করা প্রযুক্তিগত সেন্সরগুলো মাঠের খেলায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। শূন্য অভিকর্ষ পরিবেশে এ ধরনের পরীক্ষা গবেষকদের জন্য বলের আচরণ আরও স্পষ্টভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করেছে।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ‘ট্রাইওন্ডা’ নামটি এসেছে একটি স্প্যানিশ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘তিনটি তরঙ্গ’। এই নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ তাৎপর্য। কারণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র। তিন দেশের এই ঐক্য ও যৌথ আয়োজনের প্রতীক হিসেবেই বলটির নাম রাখা হয়েছে ট্রাইওন্ডা।
শুধু নামেই নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বলটি বিশেষভাবে উন্নত। এর গায়ে থাকা সেলাইয়ের বিন্যাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাতাসে চলাচলের সময় বলটি সর্বোচ্চ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে। পাশাপাশি বলের বাইরের আবরণে ব্যবহৃত বিশেষ নকশা ও উপকরণ বৃষ্টিভেজা বা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও খেলোয়াড় এবং গোলরক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সহায়তা করে।
তবে ট্রাইওন্ডার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর অভ্যন্তরে থাকা ৫০০ হার্টজ মোশন সেন্সর চিপ। আধুনিক ফুটবল প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত এই চিপ প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর সিস্টেমে পাঠায়।
এর ফলে ম্যাচ চলাকালে অফসাইডের মতো জটিল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বেশি নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয়। রেফারিরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বলের সঠিক অবস্থান ও গতিপথ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ফুটবলে এই ধরনের সেন্সর ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মহাকাশে ট্রাইওন্ডা বল নিয়ে পরিচালিত এই গবেষণা শুধু ফুটবল প্রযুক্তির উন্নয়নেই নয়, বরং বলের গতিবিদ্যা ও ভারসাম্য সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মাঠের খেলায় আরও নিখুঁত পারফরম্যান্স নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের ফুটবল প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এ গবেষণার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।





Add comment