১০০ বছরে অ্যাটেনবরোর দীর্ঘজীবনের ৪ রহস্য

প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের কিংবদন্তিতুল্য সম্প্রচারক স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো সম্প্রতি ৮ মে ১০০ বছরে পা রেখেছেন। শতবর্ষে পৌঁছেও তিনি এখনো সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, যা অনেকের কাছেই বিস্ময়ের বিষয়। নিজের দীর্ঘায়ুর রহস্য নিয়ে তিনি যদিও বিনয়ের সঙ্গে এটিকে ভাগ্য বলে উল্লেখ করেন, তবে গবেষকরা মনে করেন তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাসই তাঁকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাটেনবরোর জীবনধারা বিশ্বের বিভিন্ন “ব্লু জোন” অঞ্চলের দীর্ঘজীবী মানুষের অভ্যাসের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম তাঁর শততম জন্মদিনে তাঁর নামে একটি নতুন বোলতা প্রজাতির নামকরণ করে বিশেষ সম্মান জানায়, যার নাম রাখা হয়েছে ‘অ্যাটেনবরোনকুলাস টাউ’। প্রকৃতির প্রতি তাঁর অবদানকে এটি একটি প্রতীকী স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘ জীবনের পেছনে গবেষকরা তাঁর চারটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন।

১। রেড মিট থেকে দূরে থাকা
অ্যাটেনবরো পুরোপুরি নিরামিষভোজী নন, তবে তিনি খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রেড মিট এড়িয়ে চলেন এবং ফ্লেক্সিটারিয়ান ডায়েট অনুসরণ করেন। অর্থাৎ তিনি ডিম, দুধ ও সামুদ্রিক মাছ খেলে থাকেন, তবে উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের ওপর বেশি নির্ভর করেন। বিশেষ করে স্যামন, টুনা, ম্যাকেরেল ও সার্ডিনের মতো মাছের মধ্যে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হিসেবে পরিচিত, যা তাঁর সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে।

২। প্রকৃতির সঙ্গে অল্প সময়ের সংযোগ
গবেষণা বলছে, প্রকৃতির মাঝে মাত্র ১০ মিনিট কাটালেও মানসিক চাপ কমে যায় এবং মন ভালো থাকে। অ্যাটেনবরো নিজেও বারবার প্রকৃতির নীরবতা উপভোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সুযোগ পেলেই শান্তভাবে কোথাও বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করা উচিত, কারণ প্রকৃতির ছোট ছোট পরিবর্তনও চোখে ধরা পড়ে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাও এই ধারণাকে সমর্থন করে, যেখানে বলা হয়েছে প্রকৃতির সংস্পর্শ মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। জাপানের “ফরেস্ট বাথিং” ধারণাও একই ধরনের অভ্যাসকে উৎসাহিত করে।

৩। জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কাজের প্রতি ভালোবাসা
১৯৫২ সালে বিবিসিতে কাজ শুরু করার পর থেকে অ্যাটেনবরো কখনো অবসর নেননি। তিনি বিশ্বাস করেন, কাজের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত রাখে। তাঁর মতে, প্রকৃতি নিয়ে কাজ কখনোই বিরক্তিকর নয়, বরং এটি জীবনের অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকলে তা মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। জাপানের ওকিনাওয়া অঞ্চলের “ইকিগাই” ধারণাও এই বিষয়টিকেই নির্দেশ করে, যেখানে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটি উদ্দেশ্য থাকা জরুরি বলে মনে করা হয়।

৪। প্রাণীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা
অ্যাটেনবরোর জীবনজুড়ে প্রাণীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। বন্য প্রাণীদের কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে তাদের আচরণ বোঝা পর্যন্ত তাঁর কাজ বিস্তৃত। গবেষণা অনুযায়ী, প্রাণীদের সঙ্গে সময় কাটালে শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমে যায় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। এমনকি দূর থেকে প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করাও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তাঁর এই গভীর সংযোগ তাঁকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে বলে ধারণা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাটেনবরোর এই জীবনধারা প্রমাণ করে দেয় যে সুস্থ ও দীর্ঘজীবনের জন্য জটিল কোনো নিয়ম নয়, বরং প্রাকৃতিক জীবনযাপন, লক্ষ্যভিত্তিক কাজ এবং মানসিক শান্তিই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। শতবর্ষে পৌঁছেও তাঁর সক্রিয়তা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed