গরমের এই সময়ে কয়েক মিনিট বাইরে থাকাই যখন কষ্টকর হয়ে উঠছে, তখন যাঁদের কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় রোদে থাকতে হয়, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরমে শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে, দেখা দিতে পারে হিট এক্সহসশন বা হিটস্ট্রোকের মতো জটিল সমস্যাও। তাই বাইরে কাজ করা মানুষদের পোশাক, খাবার ও জীবনযাপারে বাড়তি সতর্কতা জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাঁদের পেশাগত কারণে বাইরে থাকতে হয়, তাঁরা সম্ভব হলে দিনের তুলনামূলক কম গরম সময় বেছে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে সময় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকলে কাজের মাঝেই শরীরের যত্ন নেওয়ার বিকল্প নেই। সামান্য অসতর্কতাও শারীরিক অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
গরমে বাইরে কাজ করার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সঠিক পোশাক নির্বাচন। হালকা রঙের নরম সুতি কাপড় এ সময় শরীরকে তুলনামূলক আরাম দেয়। পুরোনো সুতি কাপড় নতুন কাপড়ের চেয়ে বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে। আঁটসাঁট পোশাকের বদলে ঢিলেঢালা জামা পরার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে শরীরের ভেতরে বাতাস চলাচল করতে পারে।
অনেকে মনে করেন গরমে হাফহাতা বা হাতাকাটা পোশাক আরামদায়ক। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুলহাতা জামা বরং শরীরকে সরাসরি রোদ থেকে সুরক্ষা দেয়। একইভাবে হাফপ্যান্টের পরিবর্তে ফুলপ্যান্ট বা পায়জামা বেশি উপযোগী। মাথা ও চোখকে রোদ থেকে বাঁচাতে ছাতা, ক্যাপ, হ্যাট, গামছা বা রুমাল ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘাম হলে যত দ্রুত সম্ভব তা মুছে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে রুমাল বা কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে নিলে শরীর কিছুটা ঠান্ডা থাকে। সঙ্গে অতিরিক্ত কাপড় বা রুমাল রাখলে তা কাজে আসে।
গরমে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পানিশূন্যতা। তাই সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। বাইরে বের হওয়ার সময় সঙ্গে পানির বোতল রাখা উচিত। বোতলে আগে থেকে বরফ দিয়ে নিলে দীর্ঘ সময় পানি ঠান্ডা থাকে। সরাসরি রোদের মধ্যে বোতল না রাখাই ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের বোতলের তুলনায় থার্মোফ্লাস্ক নিরাপদ এবং এতে পানি দীর্ঘ সময় ঠান্ডা থাকে।
শুধু পানি নয়, স্বাস্থ্যকর পানীয়ও শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। বাড়ি থেকে ফলের রস নিয়ে বের হওয়া যেতে পারে। তরমুজ, বাঙ্গি, শসা বা অন্যান্য রসালো ফল শরীরের পানির চাহিদা পূরণে কার্যকর। পাশাপাশি এগুলো শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টিও জোগায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে শুধু পানি নয়, প্রয়োজনীয় লবণও বেরিয়ে যায়। তাই শুধু পানি পান করলেই হবে না, শরীরের লবণের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। এ জন্য পানির সঙ্গে সামান্য লবণ মিশিয়ে পান করা যেতে পারে। চাইলে ওরস্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইট ড্রিংকও কাজে লাগতে পারে। যাঁদের বেশি কায়িক শ্রম করতে হয়, তাঁরা পানীয়তে অল্প চিনি মিশিয়ে নিতে পারেন।
পানিশূন্যতা হচ্ছে কি না, তা বোঝার সহজ উপায় হলো প্রস্রাবের রং খেয়াল করা। খড়ের মতো হালকা রং স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। যদি প্রস্রাব গাঢ় হয় এবং পরিমাণে কম হয়, তাহলে বুঝতে হবে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তখন আরও বেশি পানি বা তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে।
গরমের মধ্যে নিজেকে ঠান্ডা রাখাও অত্যন্ত জরুরি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতে হবে এবং সুযোগ পেলেই ছায়াযুক্ত স্থানে কিছু সময় বসে থাকতে হবে। একটানা রোদে কাজ করা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সঙ্গে ছোট হাতপাখা বা রিচার্জেবল ফ্যান রাখলে তা উপকার দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, মাথার ওপর ভেজা রুমাল রেখে দিলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়। রুমাল শুকিয়ে গেলে আবার ভিজিয়ে নেওয়া যেতে পারে। মাঝেমধ্যে চোখে-মুখে পানি ছিটানো এবং ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নেওয়াও স্বস্তি দেয়। শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে উঠলে ঘাড়, বগল ও কুঁচকিতে বরফ চেপে রাখলে দ্রুত ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে।
খাবারের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। গরমে কম মসলাযুক্ত, কম তেলযুক্ত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাতলা ডাল, সবজি, মাছের ঝোল কিংবা আমের টক শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। অন্যদিকে ভাজাপোড়া ও গুরুপাক খাবার শরীরে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সকালবেলা অতিরিক্ত চা বা কফি পান করলে সারা দিন গরম বেশি লাগতে পারে। তাই গরমের দিনে এ ধরনের পানীয় কম খাওয়াই ভালো। স্বাস্থ্যকর খাবার ও পর্যাপ্ত বিশ্রামই পারে তীব্র গরমে শরীরকে সুস্থ রাখতে।





Add comment