মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথের মাঝামাঝি অবস্থানে ভেসে থাকা একটি বিশাল ধাতব গ্রহাণু নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সাধারণ গ্রহাণুর তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির এই মহাজাগতিক বস্তুটিতে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ধাতুর অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে রয়েছে লোহা, নিকেল, প্লাটিনাম এবং এমনকি পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত উত্তোলিত মোট সোনার চেয়েও বেশি পরিমাণ সোনা।
এই সম্ভাব্য বিপুল সম্পদের কারণে গ্রহাণুটিকে অনেকে “ট্রিলিয়ন ডলারের গ্রহাণু” বা “মহাকাশের গুপ্তধন” হিসেবে অভিহিত করছেন। এমন বিশাল খনিজ ভাণ্ডারের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে এবং এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের জন্য ইতোমধ্যে একটি মহাকাশ মিশন পরিচালনা করছে নাসা, যা স্পেসএক্সের ফ্যালকন হেভি রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
১৮৫২ সালে ইতালীয় বিজ্ঞানী অ্যানিবালে দে গ্যাসপ্যারিস প্রথম এই গ্রহাণুটি শনাক্ত করেন। “সাইকি” নামে পরিচিত এই গ্রহাণুটির ব্যাস প্রায় ২২০ কিলোমিটার। সৌরজগতের অন্যান্য সাধারণ পাথুরে বা বরফে আবৃত গ্রহাণুর তুলনায় এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বিজ্ঞানীদের মতে, কোটি কোটি বছর আগে সৌরজগত গঠনের সময় একটি প্রাচীন গ্রহে ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে, যার ফলে সেই গ্রহের বাইরের স্তর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রহের অবশিষ্ট ধাতব কেন্দ্রই আজকের এই সাইকি গ্রহাণু।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গ্রহাণুটি ধীরে ধীরে সৌরজগতের গ্রহাণু বেল্টের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের মধ্যে এটি নির্ধারিত পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে পৌঁছাবে। এই মহাজাগতিক বস্তুকে ঘিরে তথ্য সংগ্রহের জন্য ২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি বিশেষ মহাকাশযান পাঠানো হয়েছে।
তবে এই মিশনটি সরাসরি গ্রহাণুতে অবতরণ করবে না। বরং এটি গ্রহাণুটির চারপাশে ঘুরে এর গঠন, চৌম্বক ক্ষেত্র, মহাকর্ষ এবং পৃষ্ঠের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করবে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা গ্রহাণুটির প্রকৃত প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবেন।
পৃথিবীসহ অন্যান্য পাথুরে গ্রহের কেন্দ্র সাধারণত পৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার গভীরে অবস্থিত, যেখানে পৌঁছানো মানুষের প্রযুক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সে কারণে সাইকি গ্রহাণু বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এটি সত্যিই কোনো প্রাচীন গ্রহের উন্মুক্ত ধাতব কেন্দ্র হয়ে থাকে, তবে এটি পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন বোঝার ক্ষেত্রে এক বিরল সুযোগ তৈরি করবে।
এই মিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারবেন পৃথিবী কীভাবে গঠিত হয়েছিল, কীভাবে এর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে এবং আদি সৌরজগতের ভয়াবহ সংঘর্ষগুলো কীভাবে বর্তমান মহাবিশ্বের কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে শুধু খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা নয়, বরং মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এই অভিযানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।





Add comment