বিশ্বকাপে নেইমারের প্রত্যাবর্তন

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল ঘোষণাকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছিল বাড়তি উত্তেজনা। বিশেষ করে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নেইমার। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর শেষ পর্যন্ত তিনি দলে জায়গা পাবেন কি না, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন। অবশেষে কার্লো আনচেলত্তি সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন নিজের দল ঘোষণার মধ্য দিয়ে। চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন ব্রাজিলের অন্যতম বড় তারকা নেইমার।

বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় দল ঘোষণা হওয়ায় অনেক সমর্থকই অ্যালার্ম সেট করে অপেক্ষায় ছিলেন। তবে আনচেলত্তি খুব বেশি চমক দেখাননি। ফিটনেস বা সাম্প্রতিক ম্যাচ খেলার ধারাবাহিকতার চেয়ে অভিজ্ঞতা ও নির্ভরযোগ্যতাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ইতালিয়ান এই কোচ। আর সেই কারণেই দীর্ঘ বিরতির পরও নেইমারকে দলে রাখা হয়েছে। ব্রাজিলের জার্সিতে সর্বশেষ তিনি খেলেছিলেন ২০২৩ সালের অক্টোবরে।

নেইমারের অন্তর্ভুক্তি তাঁর ভক্তদের জন্য যেমন স্বস্তির খবর, তেমনি এটি আনচেলত্তির ফুটবল দর্শনেরও প্রতিফলন। কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি অভিজ্ঞ ও মানসিকভাবে শক্ত খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। চূড়ান্ত দলেও তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।

ব্রাজিলের এবারের দলকে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক বা অতিরিক্ত তারকানির্ভর বলা যাবে না। বরং অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছেন আনচেলত্তি। ২৬ সদস্যের দলে ১৫ জনই খেলেছেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। এই শতকে বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের এত অভিজ্ঞ স্কোয়াড আগে দেখা যায়নি।

দলের নেতৃত্ব নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখা হলেও জাতীয় দলে এখনো তারা প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। ফলে মাঠের ভেতর ও বাইরে এখনো নেইমারই দলের সবচেয়ে বড় ভরসা। এতে অবশ্য রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুসের ওপর চাপ কিছুটা কমবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গোলকিপার বিভাগেও অভিজ্ঞতার ওপরই জোর দিয়েছেন আনচেলত্তি। আলিসন বেকার দীর্ঘদিন চোটে ছিলেন এবং এদেরসনের ফর্মও ওঠানামার মধ্যে। ফলে তৃতীয় গোলকিপারের জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তরুণ গোলরক্ষক বেন্তো ও হুগো সোউজা সাম্প্রতিক সময়ে ভুল করায় ৩৮ বছর বয়সী ওয়েভারতনের ওপর ভরসা করেছেন কোচ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অলিম্পিক স্বর্ণ জিতেছেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও ছিলেন।

রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠেও অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। মার্কিনিওস ও গ্যাব্রিয়েলকে ঘিরে ডিফেন্স সাজানো হয়েছে। মাঝমাঠে আছেন কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারেস। বিশেষ করে কাসেমিরোর অন্তর্ভুক্তি দেখিয়ে দেয়, বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতাকে এখনো অত্যন্ত গুরুত্ব দেন আনচেলত্তি। একই কারণে দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলাররাও জায়গা পেয়েছেন।

তবে শুধু অভিজ্ঞদের নিয়েই দল গড়া হয়নি। আনচেলত্তি নতুন প্রজন্মের জন্যও দরজা খোলা রেখেছেন। বিশেষ করে আক্রমণভাগে তরুণদের অন্তর্ভুক্তি বেশ আলোচনায় এসেছে। এনদ্রিক, লুইস হেনরিক, রায়ান ও ইগর থিয়াগোর মতো ফুটবলারদের রাখা হয়েছে ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার সম্ভাব্য অস্ত্র হিসেবে।

বিশেষ করে এনদ্রিককে নিয়ে প্রত্যাশা অনেক বেশি। তরুণ এই ফরোয়ার্ড গতি, সৃষ্টিশীলতা ও অপ্রত্যাশিত আক্রমণাত্মক ফুটবলের মাধ্যমে ব্রাজিলকে বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারেন। তবে এস্তেভাও ও রদ্রিগোর না থাকা কিছুটা হতাশারও জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে এস্তেভাও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন। কিন্তু চোট তাঁর বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ব্রাজিলের এবারের দলটিকে “গ্যালাকটিকো” ধরনের ঝলমলে স্কোয়াড বলা না গেলেও এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবধর্মী দল। এখানে যেমন অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি আছে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাও। তবে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে নেইমারের ফিটনেস এবং ভিনিসিয়ুসদের ধারাবাহিকতা নিয়ে।

তবু আনচেলত্তির মতো অভিজ্ঞ কোচের অধীনে এই ব্রাজিলকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও সংগঠিত মনে হচ্ছে। হয়তো ২০০২ সালের সেই ভয়ংকর আক্রমণাত্মক দল নয়, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে অনেক সময় এমন ভারসাম্যপূর্ণ দলই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed