কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে চাকরির বাজারও। প্রযুক্তিনির্ভর অনেক নতুন পেশা ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত চাহিদা বাড়ছে ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার বা এফডিই পদের। প্রযুক্তি খাতের অনেকের কাছেই এটি এখনো তুলনামূলক কম পরিচিত একটি পেশা হলেও অল্প সময়েই এটি বিশ্বের অন্যতম উচ্চ বেতনের চাকরিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই পেশায় বছরে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ ডলার পর্যন্ত আয় করা সম্ভব, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ কোটি ৯ লাখ থেকে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকার সমান।
ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার ধারণাটি প্রথম বড় পরিসরে পরিচিতি পায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির টেকনোলজিসের মাধ্যমে। সাধারণ সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের মতো এফডিইরা কেবল অফিসে বসে কোড লেখেন না। বরং তাঁরা সরাসরি ক্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেন এবং বাস্তব ব্যবসায়িক সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরি করেন।
এই পেশাজীবীদের কাজের ধরনও বেশ আলাদা। তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে এআই প্ল্যাটফর্মকে বাস্তব ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা, ক্লায়েন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টম সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত টুল তৈরি করা, প্রতিষ্ঠানের কাজের পদ্ধতি পুনর্গঠন করা এবং দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করে প্রযুক্তিগত সমাধান দেওয়া। ফলে তাঁরা একসঙ্গে প্রকৌশলী, পরামর্শক এবং প্রোডাক্ট বিশেষজ্ঞের মতো একাধিক ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, এই পেশার চাহিদাও তত দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক চাকরির বিজ্ঞাপনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এফডিই পদের নিয়োগ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে যেখানে এ ধরনের চাকরির বিজ্ঞাপন ছিল ৬৪৩টি, সেখানে ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৩০-এ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। প্রযুক্তি খাতের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল চাকরিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও এখন এ ধরনের দক্ষ জনবল খুঁজছে। গুগল, ওপেনএআই, এন্থ্রোপিক ও স্ট্রাইপের মতো কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার পদে নিয়োগ শুরু করেছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরে এই পেশার চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
এই পদের বেতন এত বেশি হওয়ার পেছনেও রয়েছে বিশেষ কারণ। ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ারদের শুধু সফটওয়্যার তৈরি জানলেই হয় না, তাঁদের ব্যবসার বাস্তব চাহিদাও বুঝতে হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন শক্তিশালী যোগাযোগ দক্ষতা। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ব্যবসায়িক বাস্তবতার সমন্বয় ঘটাতে পারেন এমন মানুষই এই পেশায় সফল হন। এই বিরল দক্ষতার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের জন্য বড় অঙ্কের বেতন দিতে প্রস্তুত থাকে।
এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় আশঙ্কা হলো চাকরি হারানোর ভয়। তবে ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ারদের উত্থান দেখাচ্ছে ভিন্ন বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই শুধু প্রচলিত কিছু চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে না, বরং নতুন ধরনের উচ্চমূল্যের চাকরিও তৈরি করছে।
বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রমে এআই ব্যবহার করতে চাইছে। কিন্তু শুধু প্রযুক্তি কিনলেই কাজ হচ্ছে না। প্রয়োজন এমন বিশেষজ্ঞ, যাঁরা সেই প্রযুক্তিকে প্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগাতে পারবেন। ফরওয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়াররা ঠিক সেই কাজটিই করছেন।
ফলে প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই পেশাকে এখন ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যারিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং ব্যবসা বোঝার সামর্থ্য যাঁদের আছে, তাঁদের জন্য এই খাত বড় সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে এআই-নির্ভর বিশ্বে প্রযুক্তি ও বাস্তব ব্যবসার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারা পেশাজীবীদের মূল্য আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।





Add comment