বিশ্ব স্বর্ণ উৎপাদনে শীর্ষ তালিকা

বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বর্ণ এখন শুধু অলংকার বা বিলাসিতার প্রতীক নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নিরাপত্তা সম্পদ এবং ভূরাজনৈতিক শক্তির সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়তে থাকায় এই মূল্যবান ধাতুর গুরুত্ব দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ৭০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এর চাহিদার শক্ত অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে।

বিশ্বের স্বর্ণ উৎপাদন মূলত কয়েকটি শক্তিশালী দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত। ২০২৪ সালের উৎপাদন তথ্য অনুযায়ী শীর্ষ তালিকায় রয়েছে চীন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি আফ্রিকার ঘানা, মালি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোও বৈশ্বিক স্বর্ণ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল এবং ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের বিশ্লেষণে এই তালিকা প্রকাশিত হয়েছে।

শীর্ষ ১০ স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশ

১০। উজবেকিস্তান, উৎপাদন ১২৯.১ টন
মধ্য এশিয়ার এই দেশটি বর্তমানে বিশ্বের দশম বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক। দেশটির মুরুনতাউ খনিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণখনিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বর্ণ রপ্তানি উজবেকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় উৎস। সাম্প্রতিক সময়ে খনি খাতে আধুনিকায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।

৯। পেরু, উৎপাদন ১৩৬.৯ টন
দক্ষিণ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অর্থনীতি পেরু স্বর্ণ উৎপাদনে নবম স্থানে রয়েছে। আন্দিজ পর্বতমালার বিস্তৃত অঞ্চলে দেশটির বড় বড় স্বর্ণখনি অবস্থিত। স্বর্ণ রপ্তানি পেরুর অর্থনীতির একটি প্রধান ভিত্তি হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আন্দোলন এবং পরিবেশগত বিরোধ খনিশিল্পকে প্রায়ই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

৮। ইন্দোনেশিয়া, উৎপাদন ১৪০.১ টন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি স্বর্ণ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। গ্রাসবার্গ খনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণখনিগুলোর একটি এবং দেশের উৎপাদনের প্রধান উৎস। তামা ও স্বর্ণ উভয় খনিজেই ইন্দোনেশিয়ার শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। তবে বন উজাড় এবং পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে দেশটির খনিশিল্প সমালোচনার মুখে রয়েছে।

৭। মেক্সিকো, উৎপাদন ১৪০.৩ টন
উত্তর আমেরিকার এই দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণ ও রুপা উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। দেশটির উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের খনি অঞ্চলগুলো উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। তবে নিরাপত্তা সমস্যা এবং অপরাধচক্রের প্রভাব কিছু এলাকায় খনিশিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।

৬। ঘানা, উৎপাদন ১৪০.৬ টন
আফ্রিকার শীর্ষ স্বর্ণ উৎপাদক ঘানা বর্তমানে বৈশ্বিক তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। স্বর্ণ রপ্তানি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের ফলে গত এক দশকে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে অবৈধ খনন এবং পরিবেশগত ক্ষতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

৫। যুক্তরাষ্ট্র, উৎপাদন ১৫৮ টন
যুক্তরাষ্ট্রের নেভাডা, আলাস্কা এবং কলোরাডো স্বর্ণ উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল। এক সময় শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। পরিবেশগত বিধিনিষেধ, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং কিছু বড় খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবুও বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে দেশটির প্রভাব এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

৪। কানাডা, উৎপাদন ২০২.১ টন
উত্তর আমেরিকার এই দেশটি চতুর্থ বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক। অন্টারিও, কুইবেক এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঞ্চলে বড় বড় খনি রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব খনিশিল্প পরিচালনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির কারণে দেশটির উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৩। অস্ট্রেলিয়া, উৎপাদন ২৮৪ টন
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক অস্ট্রেলিয়া। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কালগুর্লি অঞ্চলসহ একাধিক খনি কেন্দ্র দেশটির উৎপাদনের মূল ভিত্তি। খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খনিশিল্প ব্যবস্থাপনা দেশটিকে বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।

২। রাশিয়া, উৎপাদন ৩৩০ টন
রাশিয়া বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদক। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ভূরাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও দেশটি উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রেখেছে। সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিস্তৃত খনি অঞ্চল দেশটির প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। স্বর্ণকে কৌশলগত রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করার নীতি রাশিয়ার অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১। চীন, উৎপাদন ৩৮০.২ টন
২০২৪ সালে ৩৮০.২ টন স্বর্ণ উৎপাদন করে চীন বিশ্বের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি এই অবস্থানে রয়েছে। শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সহায়তা, বিস্তৃত খনি নেটওয়ার্ক এবং উন্নত পরিশোধন সক্ষমতা চীনকে বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে শীর্ষে রেখেছে। শুধু উৎপাদনেই নয়, ভোক্তা হিসেবেও চীন বিশ্বে অন্যতম বড় বাজার, যেখানে গয়না শিল্প, বিনিয়োগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ—সব মিলিয়ে স্বর্ণের চাহিদা অত্যন্ত উচ্চ।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed