দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ ও কোমরে ব্যথার সমস্যা এখন অনেকের কাছেই পরিচিত এক ভোগান্তি। বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে গাড়ি চালান কিংবা পেশাগত কারণে নিয়মিত ড্রাইভিং করতে হয়, তাঁদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, কিছু সাধারণ অভ্যাস পরিবর্তন এবং সচেতনতা বাড়ালেই এ ধরনের শারীরিক অস্বস্তি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ি চালানোর সময় শরীরের ভঙ্গি সঠিক না থাকলে মেরুদণ্ড, ঘাড় ও কোমরের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় বসে থাকার কারণে পেশিতে টান তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে ব্যথা স্থায়ী রূপ নিতে পারে। তাই ড্রাইভিংয়ের সময় সঠিকভাবে বসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়ির সিট এমনভাবে সেট করা উচিত, যাতে মেরুদণ্ড সোজা থাকে এবং কোমর পর্যাপ্ত সাপোর্ট পায়। সিট খুব বেশি সামনে বা অতিরিক্ত পেছনে থাকলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পেশিতে চাপ পড়ে। হাঁটু সামান্য বাঁকা থাকবে এবং পা সহজেই প্যাডেলে পৌঁছাবে—এমন অবস্থানে সিট ঠিক করাকে আদর্শ বলা হচ্ছে।
এ ছাড়া কোমরের পেছনে ছোট কুশন বা লাম্বার সাপোর্ট ব্যবহার করলে কোমরের ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসে। দীর্ঘ সময় ড্রাইভ করার ক্ষেত্রে এটি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্টিয়ারিং ধরার ভঙ্গিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরেন অথবা কাঁধ উঁচু করে গাড়ি চালান। এতে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, কাঁধ শিথিল রেখে এবং কনুই সামান্য বাঁকা অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরতে হবে। এতে ঘাড়ের পেশিতে টান কম পড়ে এবং দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালেও অস্বস্তি তুলনামূলক কম হয়।
একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পর অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট বিরতি নেওয়া উচিত। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে কিছুটা হাঁটা, শরীর স্ট্রেচ করা কিংবা ঘাড় ও কোমর হালকা নড়াচড়া করলে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে। একই সঙ্গে পেশির শক্তভাবও কমে আসে।
নিয়মিত শরীরচর্চাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঘাড়, কোমর ও পিঠের পেশি শক্তিশালী রাখতে প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম, হাঁটা কিংবা যোগব্যায়াম উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে কোর মাসল শক্তিশালী থাকলে কোমরের ব্যথা কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রয়োজন হলে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম করাও উপকারী।
চিকিৎসকদের মতে, পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোও সমস্যার একটি বড় কারণ। ক্লান্ত শরীরে ড্রাইভিং করলে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই বাড়ে না, শরীরের পেশিতেও বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে ঘাড় ও কোমরের ব্যথা আরও তীব্র হতে পারে।
এ ছাড়া গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোন কাঁধে চেপে কথা বলা বা মাথা একদিকে কাত করে রাখার অভ্যাস থেকেও দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব ভুল অভ্যাস ধীরে ধীরে ঘাড়ের পেশিতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘাড় বা কোমরে ব্যথা থাকে, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি অনুভূত হয়, অবশ লাগে কিংবা ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকে, তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা করা ঠিক হবে না। দ্রুত একজন ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে অনেকের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে গাড়ি চালানো। কিন্তু ভুল ভঙ্গি ও অসচেতনতার কারণে এটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই সঠিক বসার অভ্যাস, নিয়মিত বিরতি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে ঘাড় ও কোমরব্যথার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।





Add comment