ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের জন্মদিন ছিল গতকাল ১৫ অক্টোবর। শৈশবে পরিবারের অভাব মেটাতে তিনি সংবাদপত্র বিলি করতেন। পরে মহাকাশ গবেষণা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে তিনি পরিচিতি পান ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ নামে। বিজ্ঞানী থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ওঠার এই যাত্রা অসংখ্য তরুণকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে তাঁর জন্ম। পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম। তাঁর বাবা নৌকা তৈরি ও ভাড়া দেওয়ার কাজ করতেন। পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারকে সাহায্য করতে মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি সংবাদপত্র বিলির কাজ শুরু করেন।
১৯৪১ সালে তাঁর দিন কাটত কঠোর রুটিনে। প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে অঙ্কের শিক্ষকের কাছে পড়তে যেতে হতো। পড়া শেষে বাড়ি ফিরে বিশ্রামের সুযোগ ছিল না। যেতে হতো তিন কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেখানে ট্রেন থামত না। চলন্ত ট্রেন থেকে ছুড়ে দেওয়া সংবাদপত্রের বান্ডিল সংগ্রহ করে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে হতো। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে নাশতা সেরে যেতেন স্কুলে। সন্ধ্যায় আবার শহরে বের হতেন সকালে বিলি করা সংবাদপত্রের বকেয়া অর্থ আদায় করতে।
১৯৫৪ সালে তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফস কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। তবে তাঁর আগ্রহের জায়গা ছিল দিগন্তবিস্তৃত আকাশ। শৈশব থেকেই আকাশে ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্ন দেখতেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, স্কুলের এক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বোর্ডে একটি পাখি এঁকে জানতে চেয়েছিলেন, পাখির মতো উড়তে পারবে কি না। কথাটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। এরপর পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন থেকে যুদ্ধবিমানের পাইলট হওয়ার ইচ্ছা জাগে।
উড়োজাহাজের প্রতি এই আকর্ষণ তাঁকে বিমান প্রকৌশল নিয়ে পড়তে উৎসাহিত করে। ১৯৫৫ সালে তিনি মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভর্তি হন। সেখানে উড়োজাহাজ নির্মাণ ও উড্ডয়নপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি নকশা ও বিভিন্ন কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পান। উড়োজাহাজ কীভাবে তৈরি হয় এবং এর বিভিন্ন অংশ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, তা জানার আগ্রহও তখন তৈরি হয়। পড়াশোনার খরচ জোগানো পরিবারের পক্ষে কঠিন ছিল। তাঁর বড় বোন নিজের সোনার গয়না বন্ধক রেখে এই ব্যয় মেটাতে সাহায্য করেন।
পড়াশোনা শেষে তিনি বিমানবাহিনীর পাইলট হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু নির্বাচিত হতে পারেননি। স্বপ্নের পেশায় যেতে না পারা ছিল তাঁর জন্য হতাশার। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, পাইলট হতে না পারলেও তাঁর কর্মজীবন প্রযুক্তি ও উড্ডয়নসংক্রান্ত কাজের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে।
১৯৫৮ সালে তিনি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও) অধীন অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে যোগ দেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় (ইসরো)। তখন ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে উপগ্রহ উৎক্ষেপণযান তৈরির চেষ্টা করছিল। তিনি দায়িত্ব পান স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল-৩ বা এসএলভি-৩ প্রকল্পের, যার লক্ষ্য ছিল নিজস্ব রকেটে উপগ্রহকে কক্ষপথে স্থাপন করা। ১৯৭৯ সালের ১০ আগস্ট প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণে দ্বিতীয় ধাপের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয় এবং উপগ্রহটি কক্ষপথে পৌঁছাতে পারেনি। তবে তিনি ও তাঁর দল উৎক্ষেপণের তথ্য বিশ্লেষণ করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করেন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন আনেন। ১৯৮০ সালের ১৮ জুলাই দ্বিতীয় উৎক্ষেপণে সফল হয় এসএলভি-৩ এবং রোহিণী আরএস-১ উপগ্রহ নিম্ন কক্ষপথে স্থাপিত হয়।
১৯৮২ সালে তিনি ডিআরডিওতে ফিরে ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের দায়িত্ব নেন, যার লক্ষ্য ছিল ভারতকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী করা। ১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় পৃথ্বী, অগ্নি, আকাশ, ত্রিশূল ও নাগ নামের পাঁচ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের মে মাসে পোখরানে পারমাণবিক পরীক্ষা ‘পোখরান-২’-এর অন্যতম সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি।
চিকিৎসাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান রয়েছে। এক হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কাজ করার সময় তিনি লক্ষ করেন, করোনারি স্টেন্ট অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি স্টেন্ট ১৯৯৮ সালে বাজারে আসে। পোলিও আক্রান্ত শিশুদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহৃত একটি উপাদান কাজে লাগিয়ে ক্যালিপারের ওজন তিন কেজি থেকে প্রায় ৩০০ গ্রামে নামিয়ে আনা হয়।
২০০২ সালে তিনি ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০২ সালের ২৫ জুলাই থেকে ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্ব দেন। সহজ জীবনযাপনের কারণে তিনি ‘জনতার প্রেসিডেন্ট’ নামে পরিচিতি পান। দায়িত্ব শেষে শিক্ষাদান ও লেখালেখি চালিয়ে যান, তাঁর আত্মজীবনী ‘উইংস অব ফায়ার’ বিশেষভাবে পরিচিত।
২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পর সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল ৮৩ বছর।





Add comment