থার্মোমিটারের বিবর্তনের অবাক ইতিহাস

শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে গেলেই আমরা থার্মোমিটার ব্যবহার করি। ঘরের তাপমাত্রা জানতেও অনেকেই এই ছোট যন্ত্রের ওপর নির্ভর করেন। ফলে ধীরে ধীরে এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ সপ্তদশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত মানুষের কাছে তাপমাত্রা পরিমাপের কোনো নির্দিষ্ট যন্ত্রই ছিল না। তখন গরম বা ঠান্ডা কেবলই একটি অনুভূতির নাম ছিল। এই অনুভূতিকে সংখ্যায় প্রকাশ করার প্রচেষ্টার সূচনা ঘটে এক ইতালীয় বিজ্ঞানীর হাত ধরে।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বিপ্লব চলছিল, তখন এক ইতালীয় বিজ্ঞানী তাপমাত্রা মাপার একটি প্রাথমিক যন্ত্র তৈরি করেন। সেটির নাম ছিল থার্মোস্কোপ। কাচের নলযুক্ত এই যন্ত্রের এক প্রান্তে একটি বাল্ব বা গোলক থাকত এবং নিচের অংশটি খোলা অবস্থায় একটি পানির পাত্রে ডুবানো থাকত। বাল্বের ভেতরের বাতাস গরম হলে তা প্রসারিত হতো এবং নলের ভেতরের পানির স্তর নিচে নেমে যেত। তবে এতে কোনো নির্দিষ্ট স্কেল বা দাগ ছিল না। ফলে এটি শুধু তাপমাত্রার পরিবর্তন বোঝাতে পারত, কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ জানাতে পারত না।

১৬১২ সালের দিকে এক ভেনিসীয় পণ্ডিত এই থার্মোস্কোপে প্রথমবারের মতো স্কেল যুক্ত করেন। তিনিই প্রথমবারের মতো এই যন্ত্রকে চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। রোগীকে কখনো বাল্ব হাতে ধরতে হতো, আবার কখনো তাতে নিশ্বাস ফেলতে হতো, যাতে তাপমাত্রার পরিবর্তন বোঝা যায়। তিনি স্কেলের সর্বনিম্ন মান নির্ধারণ করেন গলিত তুষার দিয়ে এবং সর্বোচ্চ মান নির্ধারণ করেন মোমবাতির শিখা দিয়ে।

পরবর্তীতে ১৬৫০ এর দশকে টাস্কানির গ্র্যান্ড ডিউক এই যন্ত্রের নকশায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। তাঁর উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বাতাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বা সিল করা থার্মোমিটার তৈরি করা হয়। এটি তখন বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল। এই যন্ত্রে পানির পরিবর্তে পাতিত ওয়াইন ব্যবহার করা হতো। এই নতুন ধরনের থার্মোমিটারগুলো ফ্লোরেন্টাইন থার্মোমিটার নামে পরিচিতি লাভ করে।

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে তাপমাত্রা পরিমাপের ক্ষেত্রে কোনো একক মানদণ্ড ছিল না। বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। কেউ মাখনের গলনাঙ্ককে ভিত্তি ধরতেন, কেউ প্রাণীর শরীরের তাপমাত্রাকে মানদণ্ড বানাতেন, আবার কেউ প্যারিস অবজারভেটরির ভূগর্ভস্থ কক্ষের তাপমাত্রাকে মান হিসেবে গ্রহণ করতেন। এই বিশৃঙ্খল অবস্থার সমাধানে প্রথম উদ্যোগ নেন এক ড্যানিশ জ্যোতির্বিদ। তিনি ১৭০১ সালে প্রস্তাব করেন যে, পানির হিমাঙ্ক এবং স্ফুটনাঙ্ককে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।

এরপর থার্মোমিটারের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম হিসেবে উঠে আসে এক জার্মান বিজ্ঞানীর নাম। তাঁর জীবনে ছিল নানা নাটকীয়তা। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে তাঁর বাবা মা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তিনি ব্যবসার পরিবর্তে বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং ঋণের কারণে দেশত্যাগ করে দীর্ঘ সময় যাযাবর জীবন কাটান। পরবর্তীতে তিনি ড্যানিশ জ্যোতির্বিদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর স্কেলকে আরও উন্নত করেন। তিনি তরল হিসেবে পানির পরিবর্তে পারদ ব্যবহার শুরু করেন, যা আরও নির্ভুল ফলাফল দিত। তিনি বরফ, পানি এবং লবণের মিশ্রণকে শূন্য ডিগ্রি ধরে একটি নতুন স্কেল তৈরি করেন। তাঁর তৈরি স্কেলে পানির হিমাঙ্ক ধরা হয় ৩২ ডিগ্রি এবং মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ধরা হয় ৯৬ ডিগ্রি।

এই উন্নয়নের পর ১৭৪২ সালে এক সুইডিশ জ্যোতির্বিদ একটি নতুন স্কেল প্রবর্তন করেন, যা ১০০ ডিগ্রির ভিত্তিতে তৈরি ছিল। তবে তাঁর মূল ধারণায় শূন্য ডিগ্রি ছিল স্ফুটনাঙ্ক এবং ১০০ ডিগ্রি ছিল হিমাঙ্ক। পরবর্তীতে এক ফরাসি পদার্থবিদ এই স্কেলটি উল্টে দেন এবং আধুনিক রূপ দেন। তখন থেকে শূন্য ডিগ্রি হিমাঙ্ক এবং ১০০ ডিগ্রি স্ফুটনাঙ্ক হিসেবে নির্ধারিত হয়। এভাবেই দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক থার্মোমিটারের জন্ম হয়, যা এখন মানব জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিমাপ যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed