মহাকাশের বিস্ময়কর জগৎ নিয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি শিক্ষামূলক সিরিজ মানুষের কাছে তুলে ধরছে আকাশ ও প্রকৃতির নানা অজানা দিক। এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে শেখানো হচ্ছে কীভাবে নক্ষত্র দেখে দিক নির্ণয় করা যায়, মেঘের ধরন বোঝা যায়, এমনকি সাধারণ গাছপালা ও শিলা চিহ্নিত করাও সম্ভব। এই পর্বে আলোচনায় এসেছে রাতের আকাশে বহুল পরিচিত ধ্রুবতারা খুঁজে পাওয়ার কৌশল।
উত্তর গোলার্ধে অবস্থানকারী মানুষের জন্য ধ্রুবতারা একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র। এটি পোলারিস নামেও পরিচিত এবং ভৌগোলিক উত্তর দিক নির্দেশ করার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। আকাশে অন্যান্য নক্ষত্রের মতো এটি ঘুরে বেড়ায় না; বরং প্রায় একই স্থানে স্থির থাকে। কারণ এটি পৃথিবীর উত্তর মেরুর প্রায় সরাসরি উপরে অবস্থান করছে। ফলে রাতের আকাশে এটি খুঁজে পাওয়া গেলে সহজেই উত্তর দিক নির্ধারণ করা যায়।
ধ্রুবতারা খুঁজে বের করার জন্য প্রথমেই চোখ রাখতে হবে সপ্তর্ষিমণ্ডলের দিকে, যা ইংরেজিতে বিগ ডিপার নামে পরিচিত। এটি দেখতে অনেকটা হাতলযুক্ত বাটির মতো। এই নক্ষত্রপুঞ্জের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র রয়েছে, যেগুলোকে নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। বাটির নিচের প্রান্তে থাকা নক্ষত্র মেরাক এবং উপরের প্রান্তে থাকা নক্ষত্র দুভে এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
মেরাক থেকে দুভে পর্যন্ত একটি কাল্পনিক সরলরেখা কল্পনা করতে হবে। এরপর সেই রেখাটিকে দুভে থেকে সামনে বাড়িয়ে দিলে কিছু দূরেই একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র চোখে পড়বে, সেটিই পোলারিস বা ধ্রুবতারা। এই দূরত্বটি আনুমানিক ৩০ ডিগ্রি, যা হাতের তিনটি মুষ্টি পাশাপাশি ধরলে যতটা জায়গা হয় তার সমান। ধ্রুবতারা আসলে ক্ষুদ্র সপ্তর্ষিমণ্ডল বা লিটল ডিপারের হাতলের একেবারে প্রান্তে অবস্থান করে।
পোলারিস নামটির উৎস ল্যাটিন শব্দ ‘স্টেলা পোলারিস’, যার অর্থ মেরু নক্ষত্র। তবে এটি সবসময় একই নক্ষত্র ছিল না। পৃথিবীর অক্ষের ধীরে ধীরে পরিবর্তনের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেরু নক্ষত্রের অবস্থান বদলেছে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, প্রাচীন মিসরীয়রা যখন পিরামিড নির্মাণ করেছিল, তখন মেরু নক্ষত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো ড্রাকো নক্ষত্রপুঞ্জের থুবান। আবার ভবিষ্যতে, কয়েক হাজার বছর পর অন্য একটি নক্ষত্র এই অবস্থান দখল করবে।
পোলারিস নিজেও একটি বিশেষ ধরনের নক্ষত্র। এটি একটি হলুদ দানব নক্ষত্র, যার ভর সূর্যের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এবং উজ্জ্বলতা প্রায় দুই হাজার গুণ বেশি। যদিও এটি আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র নয়, তবুও খালি চোখে সহজেই দেখা যায়। এমনকি শহরের আলো দূষণের মধ্যেও এটি শনাক্ত করা সম্ভব।
দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে পোলারিসের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকাল থেকেই নাবিক ও ভ্রমণকারীরা এই নক্ষত্রের সাহায্যে পথ নির্ধারণ করতেন। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এটি একটি প্রাকৃতিক কম্পাস হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মানুষকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম।





Add comment