এয়ারবোর্ন ফিনিকসের ড্রোন সাফল্য

যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক ড্রোন ডিজাইন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

ড্রোন নকশা ও নির্মাণভিত্তিক বিশ্ব প্রতিযোগিতা ‘ডিজাইন বিল্ড ফ্লাই (ডিবিএফ)’ এ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এএইউবি) শিক্ষার্থীদের একটি দল। বিশ্বের ৩৪তম অবস্থান অর্জনের পাশাপাশি এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে তারা চতুর্থ স্থান দখল করেছে, যা বাংলাদেশের অ্যারোস্পেস শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস (এআইএএ) এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে, যেখানে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এবারের আসরে বিশ্বের ১৭৫টি বিশ্ববিদ্যালয় দল অংশগ্রহণ করে। প্রতিযোগিতাটি মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে রয়েছে নকশা প্রস্তাবনা, ড্রোন নির্মাণ এবং উড্ডয়ন পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত মূল্যায়ন।

প্রথম ধাপে প্রতিযোগীদের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ড্রোনের নকশা প্রস্তাব জমা দিতে হয়। এটিকে বলা হয় প্রোপোজাল ফেজ। দ্বিতীয় ধাপে সেই নকশার ভিত্তিতে বাস্তব ড্রোন তৈরি করা হয়। তৃতীয় ধাপে তৈরি ড্রোন আকাশে উড্ডয়ন করিয়ে নির্ধারিত মিশন সম্পন্ন করতে হয়। এই তিন ধাপের সম্মিলিত স্কোরের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয়।

এএইউবি এবার দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ২৫ সদস্যের দলটির নাম ছিল ‘এয়ারবোর্ন ফিনিকস’। দলের নেতৃত্ব দেন অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী, যিনি পুরো প্রকল্পের সমন্বয় ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালে প্রথমবার অংশ নেওয়ার পর থেকেই তারা এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে আরও প্রস্তুতি শুরু করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এয়ার কমডোর সাইফুর রহমানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তারা নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন।

এআইএএ কর্তৃপক্ষ ২০২৫-২৬ মৌসুমের রুল বুক প্রকাশের পর এয়ারবোর্ন ফিনিকস দলটি অক্টোবরে তাদের নকশা প্রস্তাব জমা দেয়। প্রথম ধাপেই তারা ১২তম স্থান অর্জন করে, যা তাদের জন্য একটি ইতিবাচক সূচনা ছিল। এরপর শুরু হয় ড্রোন নির্মাণ পর্ব। এ সময় ওজন কমানোর জন্য কার্বন ফাইবারসহ উন্নত প্রযুক্তির উপকরণ ব্যবহার করা হয়। দলের সদস্যরা অনেক সময় দিনে ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ল্যাবে কাজ করেন।

প্রোটোটাইপ উন্নয়নের অংশ হিসেবে তারা মোট চারটি সংস্করণ তৈরি করেন। এর মধ্যে প্রথম দুটি দিয়ে দেশে প্রাথমিক উড্ডয়ন পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ২০টি পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের মধ্যে ১৩টিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী রানওয়ে ব্যবহার করে সহযোগিতা প্রদান করে।

চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের উইচিটায়, ১৬ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। সেখানে এএইউবির ১১ জন সদস্য দুটি আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল (ইউএভি) নিয়ে অংশ নেন। প্রতিযোগিতার চারটি মিশনের মধ্যে তিনটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয় দলটি। এই মিশনগুলোতে ড্রোনের গতি, স্থিতিশীলতা এবং ভার বহন ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।

চতুর্থ মিশনে একটি কাপড়ের ব্যানার উড্ডয়ন করানোর কথা থাকলেও সেটি জড়িয়ে যাওয়ায় তারা সম্পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারেনি। এ বিষয়ে দলের নেতা বলেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে একই ধরনের ব্যানার উড়িয়েছিলেন, তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সেটি জড়িয়ে যাওয়ায় চূড়ান্ত অবস্থানে কিছুটা প্রভাব পড়ে। তার মতে, এই মিশন সফল হলে তারা আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারতেন।

ড্রোন নির্মাণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে আসে দলের পক্ষ থেকে। উপদেষ্টা অধ্যাপক এয়ার কমডোর সাইফুর রহমান জানান, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লাগে এবং লজিস্টিক সাপোর্ট অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকার বাইরে হওয়ায় সরঞ্জাম সংগ্রহ ও পরিবহনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়, যা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে, দলের টেকনিক্যাল রাইটিং প্রধান জানান, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের তুলনায় তাদের ল্যাব সুবিধা কিছুটা সীমিত। উন্নত গবেষণাগারের অভাবে তারা পিছিয়ে থাকলেও নিজেদের দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভালো ফলাফল অর্জন করেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারি পর্যায়ে স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালু হলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ পাবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের পথ তৈরি করবে।

এই অর্জন বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা এবং সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed