আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ: উষ্ণতা না শীতলতা?

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত মানেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে উত্তপ্ত লাভা, ধ্বংসস্তূপ আর ভয়াবহ দৃশ্যপট। কিন্তু এই অগ্ন্যুৎপাতের একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে, যা সরাসরি চোখে পড়ে না। বিস্ময়কর হলেও সত্য, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত অনেক সময় পৃথিবীকে উত্তপ্ত না করে বরং সাময়িকভাবে শীতল করে তোলে। এর পেছনে কাজ করে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিশেষ গ্যাস ও সূক্ষ্ম কণার প্রভাব।

অগ্ন্যুৎপাতের সময় বিপুল পরিমাণ সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাস এবং অতিক্ষুদ্র ধূলিকণা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্যাসগুলো উপরের স্তর, অর্থাৎ স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। ফলে সেখানে তৈরি হয় ক্ষুদ্র সালফিউরিক অ্যাসিডের ফোঁটা, যেগুলো এক ধরনের অ্যারোসল কণায় রূপ নেয়। এই অ্যারোসলগুলো মহাকাশে একটি বিশাল প্রতিফলক স্তরের মতো আচরণ করে, যা সূর্যের তাপকে সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দেয়।

বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে প্যারাসোল ইফেক্ট নামে অভিহিত করেছেন। এর ফলে সূর্যের বিকিরণের একটি বড় অংশ মহাকাশে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠে কম তাপ পৌঁছায় এবং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পায়। এই প্রভাব সাধারণত কয়েক বছর স্থায়ী হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত অ্যারোসল কণাগুলো বায়ুমণ্ডলে অবস্থান করে।

ইতিহাসে এমন কিছু অগ্ন্যুৎপাতের উদাহরণ রয়েছে, যা এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়াকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ফিলিপাইনের একটি বিখ্যাত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন টন সালফার ডাই-অক্সাইড স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পরবর্তী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়। এই ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করে।

আরও নাটকীয় উদাহরণ পাওয়া যায় ইন্দোনেশিয়ার একটি শক্তিশালী অগ্ন্যুৎপাত থেকে। এই বিস্ফোরণের পর বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ অ্যারোসল ছড়িয়ে পড়ে, যা এক ধরনের বৈশ্বিক শীতলতার সৃষ্টি করে। এর প্রভাবে ১৮১৬ সাল ইতিহাসে ‘গ্রীষ্মবিহীন বছর’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সে সময় উত্তর গোলার্ধে অস্বাভাবিক আবহাওয়া বিরাজ করে, এমনকি জুলাই মাসেও কিছু অঞ্চলে তুষারপাত দেখা যায়। ইউরোপে ব্যাপক ফসলহানি ঘটে এবং খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—যদি আগ্নেয়গিরি পৃথিবীকে শীতল করতে পারে, তাহলে কি এটি বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা বেশ স্পষ্ট মত দিয়েছেন। তাদের মতে, আগ্নেয়গিরির এই শীতলীকরণ প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি নয় এবং এটি মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবকে মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট নয়।

আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। বছরে এটি প্রায় ০.১৩ থেকে ০.৪৪ গিগাটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা মানবসৃষ্ট নির্গমনের মাত্র কয়েক দিনের সমান। অন্যদিকে শিল্পকারখানা, যানবাহন এবং অন্যান্য মানবিক কর্মকাণ্ড থেকে যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, তা দীর্ঘ সময় ধরে বায়ুমণ্ডলে থেকে যায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

এছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে উৎপন্ন সালফার অ্যারোসল বায়ুমণ্ডলে খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় না। সাধারণত এক থেকে তিন বছরের মধ্যে এগুলো বৃষ্টির মাধ্যমে নিচে নেমে আসে এবং তাদের প্রভাব কমে যায়। কিন্তু মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাস শত শত বছর ধরে বায়ুমণ্ডলে অবস্থান করে এবং ধীরে ধীরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে তোলে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আগ্নেয়গিরি এক ধরনের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করলেও তা সাময়িক এবং সীমিত প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এর ভূমিকা খুবই সীমিত, এবং মানবসৃষ্ট দূষণের প্রভাবের সামনে তা কার্যত নগণ্য।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed