মহাবিশ্বের গঠন ও বাস্তবতার গভীর স্তর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রশ্নগুলো বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো মাত্রার সংখ্যা। নতুন এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় দাবি করা হয়েছে, আমাদের পরিচিত মহাবিশ্ব আসলে চার মাত্রার নয়, বরং সাতটি মাত্রার সমন্বয়ে গঠিত। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ সাধারণত দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এবং সময় এই চারটি মাত্রার অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকে। তবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কিছু তত্ত্ব বলছে, এই দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে আরও তিনটি অতিরিক্ত মাত্রা রয়েছে, যা সরাসরি অনুভব করা সম্ভব নয় এবং অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ভাঁজ হয়ে রয়েছে।
এই তত্ত্বটি মূলত মহাবিশ্বের অন্যতম জটিল ধাঁধা ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করছে। ১৯৭০ এর দশকে এক প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ধারণা দেন যে ব্ল্যাকহোল থেকে এক ধরনের বিকিরণ নির্গত হয়, যা পরবর্তীতে হকিং রেডিয়েশন নামে পরিচিতি পায়। এই বিকিরণের ফলে সময়ের সাথে সাথে ব্ল্যাকহোল ধীরে ধীরে শক্তি হারায় এবং এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এখানেই তৈরি হয় একটি বড় বৈজ্ঞানিক সংকট।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি হলো তথ্য কখনো ধ্বংস হয় না। কিন্তু ব্ল্যাকহোল যদি সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়, তবে এর ভেতরে থাকা তথ্যের কী হবে, সেই প্রশ্ন বহু দশক ধরে বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে চলা এই তথ্য ধ্বংস সংক্রান্ত দ্বন্দ্বকে বলা হয় ইনফরমেশন প্যারাডক্স। এই সমস্যার একটি নতুন ব্যাখ্যা সামনে এনেছেন স্লোভাক একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষকেরা।
তাদের প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রকৃত গঠন সাতটি মাত্রার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে চারটি হলো পরিচিত স্থানিক ও কালিক মাত্রা, আর বাকি তিনটি হলো অতিরিক্ত সূক্ষ্ম মাত্রা, যা এতটাই শক্তভাবে পেঁচানো অবস্থায় রয়েছে যে সেগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এই গবেষণায় জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী রিচার্ড পিনকাক ব্যাখ্যা করেন যে এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো অত্যন্ত ঘনভাবে জট পাকানো অবস্থায় থাকে, ফলে মানব ইন্দ্রিয় বা বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে সেগুলো অনুভব করা সম্ভব নয়।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ব্ল্যাকহোল যখন ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে সবচেয়ে ক্ষুদ্র অবস্থায় পৌঁছে যায়, তখন এর ভেতরে থাকা সাতটি মাত্রা এক ধরনের জটিল অবস্থায় প্রবেশ করে। এই জটিল ভাঁজ থেকে একটি বিশেষ বহির্মুখী শক্তির সৃষ্টি হয়, যাকে টরশন বলা হয়। এই শক্তি ব্ল্যাকহোলকে সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যেতে বাধা দেয়। এর ফলে ব্ল্যাকহোল পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ হিসেবে টিকে থাকে।
এই অবশিষ্টাংশের আকার এতটাই ক্ষুদ্র যে এটি একটি ইলেকট্রনের তুলনায় প্রায় ১০ বিলিয়ন গুণ ছোট বলে ধারণা করা হয়। গবেষকদের মতে, এই ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশই ব্ল্যাকহোলের ভেতরে থাকা সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে। ফলে তথ্য কখনো হারিয়ে যায় না, বরং একটি স্থায়ী স্মৃতি হিসেবে টিকে থাকে। এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে বহুদিনের ইনফরমেশন প্যারাডক্সের একটি সম্ভাব্য সমাধান পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই নতুন তত্ত্ব আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশগুলোই সম্ভবত ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য পদার্থের উৎস, যা মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৭ শতাংশ গঠন করে। পাশাপাশি তিনটি গোপন মাত্রা এবং টরশন ফিল্ডের পারস্পরিক ক্রিয়া গড পার্টিকেল বা হিগস বোসন কণার এমন বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে পারে, যা অন্যান্য কণাকে ভর প্রদান করে।
যদি এই ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন কিছু কণার অস্তিত্ব পাওয়া যেতে পারে, যেগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রার প্রভাব বিদ্যমান। এই ধরনের কণার শক্তি বর্তমান লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের সক্ষমতার চেয়ে কয়েক মিলিয়ন গুণ বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, বিগ ব্যাং এর পরবর্তী অবশিষ্ট বিকিরণ কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন এবং মহাকাশের প্রাচীন মহাকর্ষীয় তরঙ্গ গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই সাত মাত্রার অস্তিত্বের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে।





Add comment