যুক্তরাজ্যের আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্ব লন্ডনের নিউহাম কাউন্সিলে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক প্রার্থী, যিনি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই মনোনয়নের মাধ্যমে নিউহামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কেউ লেবার পার্টির পক্ষ থেকে মেয়র পদে লড়ার সুযোগ পেলেন।
আগামী ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভ পার্টি, গ্রীন পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হবেন। ফলে নির্বাচনটি ইতোমধ্যেই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পূর্ব লন্ডনের এই বরোটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখানে বিশ্বের দুই শতাধিক ভাষাভাষী মানুষের বসবাস রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নিউহামে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাসিন্দা রয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জুড়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
নিউহাম বরো দীর্ঘদিন ধরে লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৫ সালে বরোটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি কখনোই লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। ফলে আসন্ন নির্বাচনেও দলটির অবস্থান ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রার্থীটির পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। তাঁর বাবা ও মা ষাটের দশকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হন। তিনি নিজে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন এবং নিউহামেই বেড়ে ওঠেন। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে তিনি নিউহাম সিক্সথ ফর্ম কলেজ থেকে এ–লেভেল সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন থেকে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে তিনি লন্ডন অলিম্পিক বিড টিমে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ সাত বছর জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থায় প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের বড় অবকাঠামো প্রকল্প লওয়ার থেমস ক্রসিংয়ে যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি কমিউনিটি উন্নয়ন এবং ক্রিকেট কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।
২০০৬ সালে একটি স্থানীয় পরিকল্পনা ইস্যুতে সাধারণ মানুষের পক্ষে কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর রাজনীতিতে আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তীতে লেবার পার্টিতে যোগ দিয়ে ২০১০ সালে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দায়িত্ব পালনকালে তিনি কাউন্সিলের ক্যাবিনেটে কমিউনিটি নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দায়িত্বে ছিলেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নির্বাচিত হলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানই হবে তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি পরিচ্ছন্নতা খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, যত্রতত্র ময়লা ফেলা রোধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রতিটি এলাকায় এনফোর্সমেন্ট টিমের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার এবং গাড়ির মালিকদের জন্য প্রথম পার্কিং পারমিট বিনামূল্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমিউনিটি ব্যালট চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে নিউহামকে একটি অংশগ্রহণমূলক, সেবামুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বরো হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করবেন।
বর্তমানে নিউহাম বরোয় তিনটি পার্লামেন্টারি আসন রয়েছে এবং তিনটিতেই লেবার পার্টির প্রতিনিধিরা নির্বাচিত। লন্ডনের ৩২টি বরোর মধ্যে মাত্র চারটিতে নির্বাহী মেয়র ব্যবস্থা চালু আছে, যার একটি নিউহাম।
অন্যদিকে পূর্ব লন্ডনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বরো টাওয়ার হ্যামলেটসেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নেতৃত্বের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সেখানে বর্তমান মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক, যিনি আবারও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। একই বরোয় লেবার পার্টির পক্ষ থেকেও আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে এই দুই বাংলাদেশি প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আবারও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে ধারণা করা হচ্ছে।





Add comment