ডাইনোসরের যুগে পৃথিবীর স্থলভাগে যেমন ভয়ংকর শিকারি হিসেবে রাজত্ব করত টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স, তেমনি প্রাচীন সমুদ্রের গভীরেও ছিল এক দানবীয় শিকারির আধিপত্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে আবিষ্কৃত কোটি কোটি বছর পুরোনো একটি জীবাশ্মের নতুন বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এমনই এক বিশাল সামুদ্রিক শিকারির অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছেন। প্রাণীটির নাম দেওয়া হয়েছে টাইলোসরাস রেক্স, যার অর্থ ‘টাইলোসরাসদের রাজা’।
বিজ্ঞানীদের মতে, টাইলোসরাস রেক্স ছিল মোসাসর পরিবারের একটি সদস্য। এই সামুদ্রিক সরীসৃপেরা ক্রিটেসিয়াস যুগে পৃথিবীর সমুদ্রে বিচরণ করত। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১৪ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে তারা সমুদ্রজগতের অন্যতম শীর্ষ শিকারি হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশাল আকার, শক্তিশালী চোয়াল এবং ভয়ংকর শিকারি স্বভাবের কারণে গবেষকেরা প্রাণীটিকে ‘সমুদ্রের টি-রেক্স’ বলেও অভিহিত করেছেন।
আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির বুলেটিনে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, টেক্সাসে আগে আবিষ্কৃত প্রায় ৮ কোটি বছর পুরোনো জীবাশ্ম পুনরায় পরীক্ষা করে এই নতুন প্রজাতির পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রাণীটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪৩ ফুট, যা বর্তমানে পরিচিত বৃহত্তম সাদা হাঙরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বিশালদেহী এই সামুদ্রিক শিকারির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর অত্যন্ত শক্তিশালী চোয়াল। গবেষকদের ধারণা, এটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রাণীর মাথার খুলি গুঁড়িয়ে দিতে পারত। শুধু তাই নয়, এই প্রাণীরা নিজেদের প্রজাতির সদস্যদের সঙ্গেও ভয়ংকর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ত বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত জাদুঘরের এক গবেষক জানান, টেক্সাসে অনেক কিছুই আকারে বড় হয়ে থাকে এবং এই মোসাসরগুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি সত্য। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আবিষ্কৃত জীবাশ্মটি দীর্ঘদিন ধরে ভুলভাবে টাইলোসরাস প্রোরিজার নামে পরিচিত একটি অপেক্ষাকৃত ছোট প্রজাতির তালিকায় রাখা হয়েছিল। সেই প্রজাতির প্রথম জীবাশ্ম ১৮৬৯ সালে শনাক্ত করা হয়।
তবে জাদুঘরের সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত নমুনাগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করতে গিয়ে গবেষকের নজরে আসে বেশ কিছু অমিল। সেসব অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই ইঙ্গিত দেয় যে জীবাশ্মটি আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রজাতির হতে পারে। এরপর বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকেরা নিশ্চিত হন যে এটি আগে পরিচিত কোনো প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত নয়।
জানা গেছে, ১৯৭৯ সালে ডালাস শহরের বাইরে বিভিন্ন জীবাশ্মের সঙ্গে এই নমুনাগুলোও উদ্ধার করা হয়েছিল। সেই সময় পাওয়া নমুনাগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। এগুলো সাধারণ মোসাসরদের মতো ছিল না। পাশাপাশি এগুলোর আকারও ছিল পূর্বে শনাক্ত করা টাইলোসরাস প্রোরিজারের তুলনায় প্রায় ১৩ ফুট বেশি।
ডালাসের একটি জাদুঘরের কিউরেটরের মতে, মোসাসর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় এই প্রজাতি ছিল অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং সহিংস স্বভাবের। গবেষণায় ব্যবহৃত একটি নমুনায় দেখা গেছে, প্রাণীটির নাকের সামনের অংশ অনুপস্থিত ছিল এবং চোয়ালও ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, সমান শক্তিশালী বা সমপর্যায়ের আরেকটি বড় টাইলোসরাসের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় এই আঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ প্রাচীন সমুদ্রের এই দানবীয় প্রাণীরা শুধু অন্য প্রাণী শিকার করেই ক্ষান্ত থাকত না, নিজেদের মধ্যেও প্রাণঘাতী লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ত।
নতুন এই আবিষ্কার প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীদের বিবর্তন, আচরণ এবং খাদ্যশৃঙ্খল সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করেছে, পৃথিবীর অতীতের সমুদ্রজগৎ ছিল ভয়ংকর ও বৈচিত্র্যময় শিকারিতে পরিপূর্ণ এক বিস্ময়কর পরিবেশ।





Add comment