পারকিনসনস: লক্ষণ, কারণ ও নিয়ন্ত্রণ

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের চলাফেরার গতি কমে যায় এবং হাঁটার সময় ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা দেখা দেয়। তবে এই সমস্যার সঙ্গে যদি হাত বা পা কাঁপা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ যুক্ত হয়, তাহলে তা পারকিনসনস রোগের লক্ষণ হতে পারে। সাধারণত এই রোগটি বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও কিছু ক্ষেত্রে অল্প বয়সেও এটি দেখা দিতে পারে, যা চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারকিনসনস রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এই রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণ করলে পারকিনসনসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যাও এই রোগের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অল্প বয়সে কারও মধ্যে এই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে ‘উইলসন ডিজিজ’ নামের একটি বিরল রোগের সম্ভাবনাও মাথায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

পারকিনসনস রোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা প্রকট হতে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হাঁটাচলার গতি কমে যাওয়া, কথা বলার স্বর নিচু হয়ে যাওয়া এবং লেখার আকার ছোট হয়ে আসা। পাশাপাশি হাত বা পায়ে কাঁপুনি দেখা দেয়, যা অনেক সময় বিশ্রামের সময়ও থাকতে পারে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে দৈনন্দিন কাজকর্মে অসুবিধা হয়। হাঁটার সময় ভারসাম্য রাখতে সমস্যা হওয়াও এই রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

শুধু শারীরিক উপসর্গেই সীমাবদ্ধ নয়, পারকিনসনস রোগে মানসিক কিছু পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, উদ্বেগ, অস্থিরতা এবং দুশ্চিন্তা বৃদ্ধি পায়। এসব উপসর্গ রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে এবং চিকিৎসার ক্ষেত্রে আলাদা মনোযোগ দাবি করে।

চিকিৎসকদের মতে, পারকিনসনস রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই রোগ শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানানো প্রয়োজন। পাশাপাশি চিকিৎসা পদ্ধতি, ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও সচেতন করা জরুরি।

এই রোগের মূল কারণ হিসেবে মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক রাসায়নিকের ঘাটতিকে দায়ী করা হয়। ফলে চিকিৎসায় ডোপামিন-জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যেগুলোর প্রতিটিরই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এ ধরনের কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তনও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত ব্যায়াম পারকিনসনস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বিশেষ করে যাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হয়, তারা চলাফেরার সময় সহায়ক লাঠি ব্যবহার করলে উপকৃত হতে পারেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারকিনসনস রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ‘ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন’ নামে একটি বিশেষ ধরনের শল্যচিকিৎসা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ওষুধে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় এমন রোগীদের জন্য কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পারকিনসনস রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়ম মেনে চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে রোগীরা দীর্ঘদিন তুলনামূলক স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। সঠিক চিকিৎসা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারাই এই রোগ মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed