গরমে পানিশূন্যতা কেন বড় ঝুঁকি

চৈত্র-বৈশাখের তীব্র গরমে শরীরের পানির ঘাটতি বা পানিশূন্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তাপপ্রবাহের সময় ঘাম বেশি হওয়ায় শরীর দ্রুত পানি হারায়, ফলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার তৃষ্ণা মেটাতে অনেকেই অস্বাস্থ্যকর পানীয় গ্রহণ করেন, যা ডায়রিয়া বা বমির কারণ হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

মানবদেহের কোষের অন্যতম প্রধান উপাদান পানি। কোষের গঠন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। তবে শুধু পানিশূন্যতাই নয়, অতিরিক্ত পানি গ্রহণও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

পানিশূন্যতার প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ বলে মনে হলেও এগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়। মাথাব্যথা, মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, ঠোঁট ফেটে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পিপাসা—এসবই পানির ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। অনেকেই কারণ না জেনে মাথাব্যথার জন্য ওষুধ সেবন করেন, কিন্তু মূল সমস্যা থেকে যায়। এছাড়া মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া পানিশূন্যতার সাধারণ উপসর্গ।

দীর্ঘ সময় ধরে পানির ঘাটতি থাকলে তা শরীরের ভেতরে নানা জটিলতার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে কিডনির ওপর এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি না পেলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় এবং রং গাঢ় হয়। এতে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমতে থাকে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি প্রস্রাবে সংক্রমণ এবং মূত্রনালিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়, যা নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

পানিশূন্যতা শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি মস্তিষ্ক ও হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্তের তরল অংশ কমে গিয়ে রক্তচাপ হ্রাস পায়। এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয় এবং হৃদ্‌যন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

পরিপাকতন্ত্রও পানির ওপর নির্ভরশীল। পানিশূন্যতা হলে হজমে সমস্যা দেখা দেয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি বাড়ে। এতে পেটে অস্বস্তি, ক্ষুধামান্দ্য এবং দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটে। গুরুতর অবস্থায় পানিশূন্যতা মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলে। এতে বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ এমনকি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

পানিশূন্যতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত পানি পান করা। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে পানি পান করা উচিত। গরমের সময় সব বয়সীদেরই পানি গ্রহণের পরিমাণ কিছুটা বাড়ানো প্রয়োজন। ডাবের পানি এ ক্ষেত্রে ভালো বিকল্প হলেও চা-কফি কমিয়ে আনা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা জরুরি।

খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা যেতে পারে। পানির পরিমাণ বেশি এমন ফল ও সবজি খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। ঝোলযুক্ত খাবার এবং পাতলা ডাল গরমে শরীরের জন্য উপকারী। বাইরে বের হলে সঙ্গে পানির বোতল রাখা প্রয়োজন, তবে প্লাস্টিকের বোতলের পরিবর্তে থার্মোফ্লাস্ক ব্যবহার করা নিরাপদ।

পানির নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফোটানো বা ফিল্টার করা পানি পান করা উচিত। পানি ফুটে ওঠার পর আরও কিছু সময় চুলায় রেখে জীবাণুমুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পানির পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং খাদ্য প্রস্তুতের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, একবারে বেশি পানি পান না করে বারবার অল্প করে পানি পান করা ভালো। প্রস্রাবের রং পর্যবেক্ষণ করেও পানিশূন্যতার অবস্থা বোঝা যায়। স্বাভাবিক প্রস্রাবের রং হালকা হলে তা স্বাভাবিক, আর গাঢ় রং হলে পানির ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

সব মিলিয়ে, গরমে পানিশূন্যতা একটি নীরব কিন্তু গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। সচেতনতা এবং সঠিক অভ্যাসই পারে এই ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed