নীরব ঘাতক কোলন ক্যানসার সচেতনতা জরুরি

কলোরেক্টাল ক্যানসার, যা কোলন বা মলদ্বারের ক্যানসার নামেও পরিচিত, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি উদ্বেগজনক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বৃহদান্ত্রের অংশ কোলন বা মলদ্বার থেকে এ ক্যানসারের উৎপত্তি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে শুধু প্রবীণ নয়, তরুণদের মধ্যেও এ রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা চিকিৎসকদের জন্য নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে এই ক্যানসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোলন ক্যানসারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ অনেক সময় স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় না। প্রায় ৫০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে শুরুতে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তবুও কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে, যা অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, পেটব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের অবনতি—এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ক্যানসারের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে প্রবীণ এবং পুরুষদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়া খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ, লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত মাংস বেশি খাওয়া, অ্যালকোহল পান, ধূমপান, স্থূলতা এবং শারীরিক ব্যায়ামের অভাব কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে শারীরিক কার্যকলাপের অভাব সরাসরি এ রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বেশ কিছু কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। কোলনোস্কোপি বা সিগময়েডোস্কোপির মাধ্যমে কোলনের ভেতরের সন্দেহজনক অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে টিউমারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এছাড়া ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে কতটুকু ছড়িয়েছে তা নির্ণয়ের জন্য বুক, পেট এবং পেলভিসের সিটি স্ক্যান করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পিইটি স্ক্যান ও এমআরআইও ব্যবহার করা হতে পারে। বিশেষ করে টিউমারের অবস্থান নির্ধারণ এবং অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনায় এমআরআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগের পর্যায় ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে সার্জারি, রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় একাধিক পদ্ধতি একসঙ্গে প্রয়োগ করে রোগীর সর্বোত্তম ফলাফল নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।

প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন। ধারণা করা হয়, প্রায় অর্ধেক কলোরেক্টাল ক্যানসার জীবনাচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে যথাযথ সচেতনতা ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, আঁশসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ, ধূমপান পরিহার এবং অ্যালকোহল সেবন সীমিত রাখা কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করে।

সবশেষে বলা যায়, কোলন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণই হতে পারে এই নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানা এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed