বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা স্থূলতা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ওবেসিটি বা স্থূলতায় আক্রান্ত। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এদের মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি শিশু ও কিশোর-কিশোরী। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক মানুষই ওজনাধিক্য বা স্থূলতায় ভুগতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষের অকালমৃত্যুর পেছনে স্থূলতাজনিত অসংক্রামক রোগ দায়ী। এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রতি বছর ৪ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব স্থূলতা দিবস। চলতি বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কমপক্ষে ৮০০ কোটি কারণ রয়েছে কেন আপনি স্থূলতা প্রতিরোধে সচেতন হবেন। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্যই বিষয়টি গুরুত্বের দাবি রাখে।
আপনার ওজন স্বাভাবিক কি না
নিজের ওজন সঠিক আছে কি না তা নির্ণয় করা খুবই সহজ। প্রয়োজন শুধু একটি ওজন মাপার যন্ত্র এবং একটি মাপার ফিতা। প্রথমে নিজের ওজন কিলোগ্রামে মাপুন। এরপর উচ্চতা মিটারে নিয়ে তার বর্গ করুন। ওজনকে উচ্চতার বর্গ দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যাবে বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই।
বর্তমানে স্মার্টফোনে বিএমআই ক্যালকুলেটর অ্যাপ ব্যবহার করেও সহজে এ হিসাব করা যায়। যদি কারও বিএমআই ২৫ বা তার বেশি হয়, তবে তাকে ওভারওয়েট বা ওজনাধিক্য ধরা হয়। আর বিএমআই ৩০-এর বেশি হলে তা স্থূলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ৪০-এর বেশি হলে তা গুরুতর স্থূলতার পর্যায়ে পড়ে।
তবে এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মানদণ্ড কিছুটা ভিন্ন। এশীয়দের জন্য বিএমআই ২৩ বা তার বেশি হলে ওজনাধিক্য এবং ২৭ বা তার বেশি হলে স্থূলতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
স্থূলতা প্রতিরোধে ছয়টি কার্যকর অভ্যাস
স্থূলতা প্রতিরোধে দৈনন্দিন জীবনে কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে দেশের শীর্ষ হরমোন বিশেষজ্ঞদের সংগঠন। তারা ছয়টি মূল পদক্ষেপ অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রথমত, চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি পরিহার করতে হবে। শূন্য চিনি বা চিনিমুক্ত পানীয় বেছে নেওয়া উত্তম।
দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম করতে হবে। হাঁটা, দৌড়, সাইক্লিং কিংবা যে কোনো সক্রিয় ব্যায়াম এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তৃতীয়ত, স্ক্রিন টাইম দুই ঘণ্টার কম রাখতে হবে। দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়ায়, যা স্থূলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
চতুর্থত, দিনে তিন বেলা পরিমিত ও সুষম খাবার গ্রহণ করা জরুরি। অতিরিক্ত খাওয়া কিংবা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, চিকিৎসার ক্ষেত্রে চারটি মূল ভিত্তি অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিদিন কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের হরমোনীয় ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, যা ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়।
স্থূলতা কেন অবহেলার নয়
মনে রাখতে হবে, স্থূলতা কেবল একটি শারীরিক অবস্থা নয়; এটি একটি স্বীকৃত রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে চার শতাধিক রোগের সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিল অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি স্থূলতার কারণে বেড়ে যায়।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাজারে স্থূলতা কমানোর নানা টোটকা, হারবাল পণ্য ও ভ্রান্ত ডায়েট পদ্ধতির প্রচার দেখা যায়। তবে এসব পদ্ধতির অধিকাংশই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। বরং নিয়মিত ছয়টি অভ্যাস চর্চার মাধ্যমে স্থূলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রয়োজনে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করাই হতে পারে স্থূলতা মোকাবিলার কার্যকর উপায়।





Add comment