১৭৯১ সালে ফরাসি উপনিবেশ সেন্ট ডোমিঙ্গোতে, যা আজকের হাইতি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অমানবিক নির্যাতনের শিকার আফ্রিকান দাসেরা ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন। দাসপ্রথা, বর্ণবাদী নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান প্রথমে সংগঠিত হয় এক বিপ্লবী নেতার নেতৃত্বে এবং পরবর্তী সময়ে আরেক সেনাপতির অধীনে তা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাসংগ্রামে রূপ নেয়। টানা ১৩ বছরের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে তারা ফরাসি, ব্রিটিশ ও স্প্যানিশ বাহিনীকে পর্যায়ক্রমে পরাজিত করে। দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ১৮০৪ সালে আত্মপ্রকাশ করে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র, হাইতি।
১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার প্রায় তিন দশক পর, ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি হাইতি তাদের স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণ করে। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা গোলার্ধের সবচেয়ে সফল দাস বিদ্রোহের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এবং বিশ্ব মানচিত্রে এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। হাইতির স্বাধীনতা ছিল না কেবল কোনো উপনিবেশিক অভিজাত শ্রেণির রাজনৈতিক বিচ্ছেদ; এটি ছিল শোষিত মানুষের রক্তে লেখা গণঅভ্যুত্থান।
ঐতিহাসিকদের মতে, স্বাধীনতার প্রাক্কালে ঘোষণাপত্রের একটি প্রাথমিক খসড়া তুলনামূলক সংযত ও আইনি ভাষায় রচিত হয়েছিল, যার কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাপত্রের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে বিপ্লবী নেতৃত্ব মনে করেছিল, সে ভাষা তাদের সংগ্রামের গভীর ক্ষোভ ও আত্মত্যাগের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারছে না। ফলে দলিলটি নতুনভাবে রচনা করা হয় এক মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ বুদ্ধিজীবীর হাতে, যিনি ছিলেন ঘোষণাপত্রের মূল প্রণেতা ও জনসমক্ষে পাঠকারী।
তিনি ঘোষণা লেখার আগে যে উক্তিটি করেছিলেন, তা বিপ্লবী মানসিকতার প্রতীক হয়ে আছে: স্বাধীনতার দলিল লেখার জন্য প্রয়োজন শত্রুর চামড়া পার্চমেন্ট হিসেবে, তাদের মাথার খুলি দোয়াত হিসেবে, রক্ত কালি হিসেবে এবং একটি বেয়নেট কলম হিসেবে। ১৮০৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে রচিত সেই দলিল পরদিন সকালে জনসমক্ষে পাঠ করা হয়।
ঘোষণাপত্রের মূল স্লোগান ছিল ‘স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু’। এতে ফরাসি উপনিবেশবাদীদের বর্বর ও রক্তপিপাসু হিসেবে অভিহিত করা হয়। দলিলে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়, যুগের পর যুগ যারা দেশকে রক্তে রঞ্জিত করেছে, তাদের তাড়িয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়; তাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাপত্রে ব্রিটিশদের ভ্রাতা বলে সম্বোধন করা হলেও, হাইতির ঘোষণাপত্রে ফরাসিদের সঙ্গে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক অস্বীকার করা হয়। প্রশ্ন তোলা হয়, ওই জাতির সঙ্গে তাদের কিসের মিল।
দলিলে আরও উল্লেখ করা হয়, সহনশীলতার বিপরীতে শাসকদের নিষ্ঠুরতা, গায়ের রঙের পার্থক্য, বিস্তীর্ণ সাগরের দূরত্ব এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে তারা কখনোই এক জাতি হতে পারে না। এমনকি শত্রুরা যদি আশ্রয়ও পায়, তবু তারা বিভেদের উৎস হিসেবেই থাকবে। একই সঙ্গে জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় নিহত স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের কথা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার অঙ্গীকার করা হলেও ফ্রান্সের প্রতি চিরস্থায়ী ঘৃণার ঘোষণা দেওয়া হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে শপথ নেওয়া হয়, পুনরায় দাসত্বে ফিরে যাওয়ার চেয়ে মৃত্যুবরণ শ্রেয়।
১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি গোনাইভে শহরে এক বিশাল জনসমাবেশে ঘোষণাপত্র পাঠের মধ্য দিয়ে হাইতি নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সহজে মেলেনি। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাইতিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান, কারণ তাদের আশঙ্কা ছিল এটি আমেরিকায় দাস বিদ্রোহ উসকে দিতে পারে। প্রায় ছয় দশক পর প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের শাসনামলে ১৮৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো হাইতিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
ফ্রান্স ১৮২৫ সালে হাইতিকে স্বীকৃতি দিলেও তার বিনিময়ে দাবি তোলে বিপুল ক্ষতিপূরণ। ফরাসি রাজা উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে চরমপত্র জারি করেন, বিপ্লবের ফলে হারানো সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিপুল অঙ্কের গোল্ড ফ্রাঁ দিতে হবে। পরবর্তীতে সেই অঙ্ক কমানো হলেও তা ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অর্থ পরিশোধে অক্ষম হাইতি উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এই ঋণ ও সুদ পরিশোধে সময় লাগে ১২২ বছর, যা দেশটির অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং দারিদ্র্যের ঐতিহাসিক ভিত্তি গড়ে তোলে।
হাইতির স্বাধীনতার ঘোষণা তাই কেবল একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘটনা নয়; এটি ছিল দাসত্ব, বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের রক্তমাখা প্রতিবাদ। বিশ্ব ইতিহাসে এটি স্বাধীনতার এক অনন্য ও আপসহীন দলিল হিসেবে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।





Add comment