বিশ্ববাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে এমন প্রত্যাশায় বুধবারও বাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আলোচনায় অগ্রগতি হলে হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তেল আবারও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে, যা সরবরাহ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।
বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ২৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৫২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। এর আগের দিন এই তেলের দাম কমেছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও কমেছে। এটি ১ দশমিক শূন্য ৪ ডলার বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ২৪ ডলারে নেমে এসেছে। আগের দিনে এই সূচকটি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে আলোচনা খুব শিগগিরই পুনরায় শুরু হতে পারে এবং তা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত সপ্তাহান্তে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছিল। তবে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সংঘাত কমে এলে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হতে পারে।
বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়া ও ইউরোপে তেল পরিবহনের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত, বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মঙ্গলবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ডেস্ট্রয়ার ইরান থেকে দুটি তেলবাহী ট্যাংকার বের হতে বাধা দিয়েছে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শর্ক গ্রুপ এক বিশ্লেষণী নোটে উল্লেখ করেছে, কূটনৈতিক তৎপরতা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তারা মনে করছে, যাতায়াতের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ সাময়িকভাবে শিথিল হতে পারে এমন ইঙ্গিত থাকলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার নিশ্চয়তা এখনো নেই।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনার চেয়ে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি জোরালো। এদিকে মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমুদ্রপথে ইরানি তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিলের যে ৩০ দিনের সময়সীমা ছিল, তা চলতি সপ্তাহেই শেষ হচ্ছে এবং এর মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। একইভাবে রাশিয়ার তেলের ওপর দেওয়া অনুরূপ শিথিলতাও ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত তেলের সরবরাহের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সাপ্তাহিক মজুত প্রতিবেদনের দিকে। জরিপ অনুযায়ী, গত সপ্তাহে দেশটিতে অপরিশোধিত তেলের মজুত সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সময়ে ডিজেল ও পেট্রলের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে টানা তৃতীয় সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের মজুত বেড়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে, গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় অচলাবস্থা এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধের পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়লে বাজারে উল্টো চিত্র দেখা যায়। তখন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৬ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ১০৪ দশমিক ৮২ ডলারে উঠে যায় বলে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানির সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটকে তীব্র করে তুলতে পারে।





Add comment