মহাবিশ্বের গভীর অন্ধকার থেকে মাঝেমধ্যেই পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে উল্কাপিণ্ড। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় এগুলো আকাশে তীব্র আলোর ঝলকানি তৈরি করে এবং অনেক সময় শক্তিশালী বিস্ফোরণের মতো শব্দও সৃষ্টি করে। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের আকাশে এমনই এক শক্তিশালী ও রহস্যময় উল্কাপিণ্ড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র কম্পন ও শব্দের অনুভূতি তৈরি করে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর ২টা ৬ মিনিটে উল্কাপিণ্ডটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এরপর এটি উত্তর-পূর্ব ম্যাসাচুসেটস এবং দক্ষিণ-পূর্ব নিউ হ্যাম্পশায়ারের আকাশে এসে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। নাসা জানায়, মহাকাশ থেকে আসার সময় বস্তুটির গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৭৫ হাজার মাইল। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর ভূপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ৪০ মাইল উচ্চতায় পৌঁছানোর পর এটি বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই আকস্মিক বিস্ফোরণের ফলে উৎপন্ন বিকট শব্দে ম্যাসাচুসেটস, নিউ হ্যাম্পশায়ার এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষজন চমকে ওঠেন। অনেক বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হঠাৎ এমন শক্তিশালী শব্দে তাদের ঘরবাড়ি এবং বড় বড় ভবন পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। শব্দ শোনার কিছুক্ষণ আগেই আকাশে একটি উজ্জ্বল আগুনের গোলকের মতো দৃশ্যও দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা উল্লেখ করেন, যা মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
নাসা তাদের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানায়, নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের বহু প্রত্যক্ষদর্শী এবং নোয়ার GOES 19 স্যাটেলাইট একই সময়ে এই উজ্জ্বল আগুনের গোলক এবং বিস্ফোরণের শব্দ শনাক্ত করেছে। সংস্থাটি আরও নিশ্চিত করে যে, উল্কাপিণ্ডটি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৪০ মাইল উচ্চতায় এসে ভেঙে পড়ার সময় এ বিস্ফোরণ ঘটে।
নাসার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উল্কাপিণ্ড ভেঙে যাওয়ার সময় যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়েছে তা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। হিসাব অনুযায়ী, বিস্ফোরণের শক্তি প্রায় ৩০০ টন টিএনটি বিস্ফোরকের সমান। এই বিপুল শক্তিই মূলত এত তীব্র শব্দ ও কম্পনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আশপাশের এলাকা পর্যন্ত অনুভূত হয়।
নাসার ডেপুটি নিউজ চিফ জেনিফার ডুরেন এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেন যে, এটি কোনো সক্রিয় উল্কাবৃষ্টির অংশ ছিল না। তিনি আরও জানান, এটি কোনো মানবসৃষ্ট মহাকাশ বর্জ্য বা স্যাটেলাইট পুনঃপ্রবেশের ঘটনাও নয়। বরং এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি মহাজাগতিক বস্তু, যা স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ভেঙে গেছে।
এদিকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি যে উল্কাপিণ্ডটির কোনো অংশ ভূপৃষ্ঠে এসে পড়েছে কি না। আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, বিস্ফোরণের ঠিক আগ মুহূর্তে এই উল্কাপিণ্ডের ব্যাস ছিল প্রায় তিন ফুট। সংস্থাটির প্রোগ্রাম পরিচালক রবার্ট লুনসফোর্ড জানান, এটি একটি সাধারণ আগুনের গোলকের তুলনায় আকারে অনেক বড় ছিল এবং বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার সময় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বায়ুমণ্ডলের প্রচণ্ড ঘর্ষণ এবং তাপমাত্রার কারণে উল্কাপিণ্ডটির অধিকাংশ অংশই পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে। যদি এর কিছু ক্ষুদ্র অংশ টিকে থেকেও থাকে, তবে সেগুলো খুবই ছোট আকারের হবে এবং জনবহুল এলাকায় পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, মহাকাশ থেকে আসা বস্তুগুলো কতটা দ্রুতগতিতে এবং শক্তিশালীভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস হয়ে যায়।





Add comment