যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এক কিশোরীর বিরল মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে মানবিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার আবেদন করেছিলেন তাঁর বাবা-মা। তবে দীর্ঘ ১০ মাস অপেক্ষার পর সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। ফলে মেক্সিকোতে অবস্থানরত পরিবারটি এখন আরও অনিশ্চয়তা ও সংকটের মুখে পড়েছে।
পরিবারটির পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে। বর্তমানে তারা মেক্সিকোর এমন একটি এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে মার্কিন নাগরিকদের অপহরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের পর থেকে মেয়েটির শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা না পাওয়ায় তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে।
পরিবারটির মেয়ে যখন ১০ বছর বয়সী, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাঁর অনথিভুক্ত বাবা-মাকে মেক্সিকোতে ফেরত পাঠায়। তাঁদের সঙ্গে আরও চার সন্তানও দেশ ছাড়ে, যাদের মধ্যে তিনজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ওই সময় শিশুটি একটি বিরল মস্তিষ্কের টিউমারের অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসাধীন ছিল। চিকিৎসকেরা তখনও টিউমারটির প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছিলেন, কারণ এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ধরনের বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বর্তমানে মেয়েটির বয়স ১২। তাঁর মা জানান, মেক্সিকোতে আসার পর মেয়েটির শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। গত মাসে সে হঠাৎ তীব্র খিঁচুনিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যায় এবং শরীরে আঘাত পায়। পরে তাকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা দূরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে এমআরআইসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ফল অস্বাভাবিক আসে।
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা পরিবারকে জানিয়েছেন, মেয়েটির মস্তিষ্ক আগের মতো পুনর্গঠন বা পুনরুদ্ধার করতে পারছে না। সাধারণত এই প্রক্রিয়া রোগীর হারিয়ে যাওয়া স্নায়বিক ক্ষমতা যেমন কথা বলা, চলাফেরা বা স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে নতুন টিউমার তৈরির ঝুঁকিও কমায়। কিন্তু এখন সেই উন্নতির পরিবর্তে মেয়েটির অবস্থার অবনতি ঘটছে।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েটি এখন প্রায়ই পেশিতে টান অনুভব করে, বিশেষ করে আংশিক অবশ ডান হাতে। ব্যথা কখনো কাঁধ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং এতটাই তীব্র হয় যে রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হয়। মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথাও আগের চেয়ে বেড়েছে। মেয়েটি সব সময় হাত মুঠো করে রাখে এবং ব্যথার কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
গত এপ্রিল মাসে পরিবারটি তিনটি পৃথক প্রত্যাখ্যানপত্র পায়। এগুলো ছিল মা, বাবা ও এক অ-নাগরিক সন্তানের মানবিক প্যারোল আবেদনের জবাব। তবে প্রত্যাখ্যানের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা সংস্থা জানিয়েছে, বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের প্যারোল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে মূল কর্তৃত্ব অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে থাকে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মেয়েটির মা বলেন, একজন মা হিসেবে তিনি সন্তানের জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু আবেদন বাতিল হওয়ার খবর তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। একই সঙ্গে মেয়ের অবস্থার অবনতির খবর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে মেক্সিকোতে এমন কোনো চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যিনি মেয়েটির সম্পূর্ণ চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি। কারণ, তার চিকিৎসার ইতিহাস অত্যন্ত জটিল এবং বিরল। তাছাড়া মেয়েটি বিমানে ভ্রমণের মতো শারীরিক অবস্থায়ও নেই।
পরিবারটির আইনজীবীর হাতে থাকা চিকিৎসা নথিতে বলা হয়েছে, শিশুটির টিউমার একটি “নতুন ও অজানা” রোগগত অবস্থার কারণে তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা তাঁর ওপর গবেষণাও চালাচ্ছিলেন। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ছাড়া এই অবস্থার সঠিক পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব।
মায়ের দাবি, মেয়েটি অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে লেখা, পূর্ণ বাক্যে কথা বলা ও স্মৃতিশক্তি ফিরে পাচ্ছিল। কিন্তু থেরাপি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই অগ্রগতি প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে তাঁর মানসিক সক্ষমতা সাত বা আট বছর বয়সী শিশুর মতো হয়ে গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মেয়েটির দেখভালের পুরো দায়িত্ব এখন মায়ের ওপর। তিনি নিজে আগে পুনর্বাসন সহকারী ও প্রশিক্ষিত নার্সিং সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিশেষ শিক্ষা সহায়তা ও জরুরি চিকিৎসা সুবিধার অভাবে তিনি অসহায় বোধ করছেন।
পরিবারটির বড় ছেলে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে গেছেন, নিয়মিত কাজ করে ছোট বোনের জন্য খিঁচুনি প্রতিরোধের ওষুধ পাঠান। তিনিও পরিবারকে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি সহায়তা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছেন। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, পরিবারটি ভবিষ্যতে আবারও মানবিক প্যারোলের আবেদন করতে পারে। তবে প্রতিটি আবেদনের খরচ এক হাজার ডলারের বেশি হওয়ায় এখন তারা কৌশলগতভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের সময়ে মানবিক প্যারোল আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ আবেদন বাতিল করা হয়েছে, যেখানে অনুমোদন পেয়েছে মাত্র প্রায় ১ হাজার ৪০০ আবেদন।
পরিবারটির মা এখনো আশা ছাড়েননি। তাঁর ভাষায়, মেয়েটির জন্মদিনগুলো এখন একই সঙ্গে আনন্দ ও কষ্টের স্মৃতি হয়ে উঠেছে। কারণ, মেয়েটি এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার পথ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।





Add comment