অন্য মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলেই ডার্ক ম্যাটার?

ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য পদার্থকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে নানা মত ও তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। মহাবিশ্বের এই রহস্যময় উপাদান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা খুঁজতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী নতুন একটি ধারণা সামনে এনেছেন, যেখানে বলা হচ্ছে ডার্ক ম্যাটার আসলে অন্য কোনো মহাবিশ্ব থেকে আগত ব্ল্যাকহোলের সমষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৭ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার দ্বারা গঠিত। এটি সরাসরি দেখা যায় না, কারণ এটি আলো শোষণ বা প্রতিফলন করে না। তবে এর উপস্থিতি অনুভব করা যায় মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে। গ্যালাক্সি বা ছায়াপথগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে ডার্ক ম্যাটার এক ধরনের অদৃশ্য আঠার মতো কাজ করে বলে ধারণা করা হয়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি এমন কিছু অজানা কণার সমষ্টি যা এখনো সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

তবে নতুন তত্ত্বটি এই প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে। এতে বলা হচ্ছে, ডার্ক ম্যাটার কোনো নতুন কণা নয়, বরং মহাবিশ্বের জন্মের আগের সময় থেকে টিকে থাকা ব্ল্যাকহোলগুলোর সমষ্টি হতে পারে। এই ব্ল্যাকহোলগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও তাদের ভর অনেক বেশি এবং এগুলো সম্পূর্ণ অদৃশ্য। কেবলমাত্র তাদের মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমেই এদের অস্তিত্ব অনুমান করা সম্ভব।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ব্যাখ্যা দেন, ডার্ক ম্যাটারের সন্ধানে ব্ল্যাকহোল এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার মতে, আমাদের বর্তমান মহাবিশ্বের আগে আরও একটি মহাবিশ্ব ছিল এবং বিগ ব্যাং ছিল সেই দুটি পর্যায়ের মধ্যবর্তী একটি রূপান্তর মাত্র। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের ইতিহাস একটি একক ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয়নি, বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্ব একটি অসীম ঘনত্ববিশিষ্ট সিঙ্গুলারিটি থেকে উৎপত্তি লাভ করে এবং পরবর্তীতে দ্রুত প্রসারণের মাধ্যমে বর্তমান রূপ ধারণ করে। কিন্তু এই সিঙ্গুলারিটির ধারণা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীর আপত্তি রয়েছে, কারণ অসীম ঘনত্বের ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত নিয়মগুলো আর কার্যকর থাকে না। নতুন তত্ত্বে এই সমস্যার একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

এই ধারণা অনুযায়ী, মহাবিশ্ব একটি ‘বাউন্সিং’ বা পুনরাবৃত্তিমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোয়। একটি পর্যায়ে মহাবিশ্ব সংকুচিত হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে অত্যন্ত ঘন অবস্থায় পৌঁছায়, তবে তা অসীম নয়। এরপর আবার এটি বিস্তৃত হতে শুরু করে, যা আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব হিসেবে পর্যবেক্ষিত হচ্ছে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিগ ব্যাং কোনো চূড়ান্ত সূচনা নয়, বরং একটি রূপান্তরের ধাপ।

নতুন এই তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মহাবিশ্বের পূর্ববর্তী সংকোচন পর্যায়ে তৈরি হওয়া ব্ল্যাকহোলগুলো ধ্বংস না হয়ে টিকে থাকতে পারে। পরবর্তীতে যখন মহাবিশ্ব আবার প্রসারিত হয়, তখন এই ব্ল্যাকহোলগুলোও সেই নতুন পর্যায়ে উপস্থিত থাকে। এরা কোনো আলো নির্গত করে না, কিন্তু তাদের মহাকর্ষীয় প্রভাব বজায় থাকে, যা ডার্ক ম্যাটারের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়।

এই ধারণা যদি সঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি বর্তমান বিজ্ঞানের কয়েকটি বড় প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হতে পারে। বিশেষ করে সিঙ্গুলারিটির অসীম ঘনত্বের সমস্যার সমাধান পাওয়া যেতে পারে এবং একই সঙ্গে ডার্ক ম্যাটার ব্যাখ্যার জন্য নতুন কোনো কণা খোঁজার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

এই তত্ত্ব যাচাই করার জন্য বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডের সূক্ষ্ম পরিমাপ ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন। ভবিষ্যতে এই পর্যবেক্ষণগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য যদি তত্ত্বটির পক্ষে যায়, তাহলে এটি আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম জটিল দুটি রহস্যের সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed