চাঁদে যাওয়ার খরচ কমাবে নতুন পথ

মহাকাশ গবেষণায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিপুল জ্বালানি ব্যয়। পৃথিবী থেকে চাঁদ কিংবা আরও দূরের গন্তব্যে মহাকাশযান পাঠাতে যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়, তা পুরো অভিযানের ব্যয়কে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা এমন বিকল্প পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যেখানে কম জ্বালানি ব্যবহার করেই মহাকাশযানকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এবার সেই প্রচেষ্টায় বড় ধরনের অগ্রগতির দাবি করেছেন একদল গবেষক। তাঁদের মতে, পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়ার এমন একটি নতুন পথ শনাক্ত করা গেছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশেষ এক গাণিতিক পদ্ধতির মাধ্যমে চাঁদে যাওয়ার নতুন গতিপথ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে অ্যাস্ট্রোডায়নামিকস সাময়িকীতে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই পথ ব্যবহার করলে জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতের মহাকাশ মিশনগুলোকে আরও কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তুলতে পারে।

গবেষকেরা জানান, ‘থিওরি অব ফাংশনাল কানেকশনস’ নামের একটি উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যকার সম্ভাব্য বহু কক্ষপথ পরীক্ষা করা হয়েছে। উন্নত কম্পিউটার মডেলিং ব্যবহার করে এসব পথের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়। মূলত পৃথিবী ও চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়েই সবচেয়ে সাশ্রয়ী গতিপথ নির্ধারণ করা হয়েছে।

মহাকাশবিজ্ঞানে ‘ভ্যারিয়েট’ বলতে বোঝানো হয় এমন একটি স্বাভাবিক গতিপথ, যা মহাকাশযানকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের অংশ ব্যবহার করেই চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করা সহজ এবং তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল। কিন্তু নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। গবেষকদের মতে, চাঁদের বিপরীত দিক দিয়ে প্রবেশ করাই বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, নতুন এই লুকানো পথ মহাকাশযানকে অতিরিক্ত মাধ্যাকর্ষণভিত্তিক চালিকা শক্তি দিতে সক্ষম। ফলে আগের সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল পথের তুলনায়ও এটি বেশি কার্যকর হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পদ্ধতিতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫৮ দশমিক ৮০ মিটার গতিবেগের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব।

গবেষকেরা আরও বলছেন, এই নতুন পথের আরেকটি বড় সুবিধা হলো পৃথিবীর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা। মহাকাশযান চাঁদের পেছনের অংশে চলে গেলে অনেক সময় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অতীতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল কয়েকটি মিশনকে। বিশেষ করে আর্টেমিস–২ মিশনের সময় মহাকাশযান চাঁদের পেছনে চলে যাওয়ায় সাময়িকভাবে যোগাযোগ হারানোর ঘটনা ঘটে। তবে নতুন প্রস্তাবিত পথ ব্যবহার করলে সেই ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

মহাকাশ অভিযানে প্রাকৃতিক মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা গ্রহ, উপগ্রহ কিংবা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর অভিকর্ষ বলকে কাজে লাগিয়ে মহাকাশযানের গতি ও দিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। এতে জ্বালানির প্রয়োজন কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি মিশন পরিচালনা সহজ হয়। সৌরজগতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব মাধ্যাকর্ষণনির্ভর পথকে বলা হয় ইন্টারপ্ল্যানেটারি ট্রান্সপোর্টেশন নেটওয়ার্ক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আবিষ্কৃত পথ ভবিষ্যতে চাঁদকেন্দ্রিক গবেষণা, মানব মিশন এবং বাণিজ্যিক মহাকাশ অভিযানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, জ্বালানি সাশ্রয় মানেই কম ব্যয়, কম ঝুঁকি এবং আরও বেশি কার্যকর মিশন। আগামী দিনে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ কিংবা নিয়মিত যাতায়াতের পরিকল্পনায়ও এই ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গবেষণাটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও এর সম্ভাবনা নিয়ে মহাকাশবিজ্ঞানীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতের মহাকাশ ভ্রমণে এটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed