মঙ্গল গ্রহে আরও বিস্তৃতভাবে তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে নতুন প্রজন্মের ছোট কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী হেলিকপ্টার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিসম্পন্ন এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মঙ্গল অভিযানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।
এর আগে নাসার তৈরি ‘ইনজেনুইটি’ নামের ছোট হেলিকপ্টারটি মঙ্গল গ্রহে সফলভাবে উড্ডয়ন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার আরও উন্নত প্রযুক্তির হেলিকপ্টার তৈরির কাজ চলছে। নতুন মডেলের এই হেলিকপ্টারের রোটর ব্লেড বা পাখার গতি আগের চেয়ে অনেক বেশি হবে। যেখানে ইনজেনুইটির রোটর ব্লেডের গতি ছিল ম্যাক শূন্য দশমিক ৭–এর কম, সেখানে নতুন মডেলটি ম্যাক ১ দশমিক ০৮–এর বেশি গতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই গতি ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
নাসার এমস রিসার্চ সেন্টারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোটর ব্লেডের এই সফল পরীক্ষা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে উড্ডয়নের সম্ভাবনাকে বাস্তবের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। তাঁদের ধারণা ছিল, ম্যাক ১ দশমিক ০৫ গতি অর্জন করতে পারলেই সেটিকে বড় সাফল্য ধরা হবে। কিন্তু পরীক্ষার শেষ ধাপে হেলিকপ্টারটি ম্যাক ১ দশমিক ০৮ গতি স্পর্শ করেছে। এ সাফল্যে গবেষক দল বেশ আশাবাদী।
নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একটি হেলিকপ্টারের রোটর ব্লেডের গতি যখন ম্যাক শূন্য দশমিক ৮ অতিক্রম করে, তখন শক ওয়েভ, বাতাসের তীব্র বাধা এবং অস্থির বায়ুপ্রবাহের মতো জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এতে উড্ডয়নযানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। পৃথিবীর পরিবেশে এসব সমস্যা মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ হলেও মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এটি অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ, পৃথিবী ও মঙ্গলের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও বায়ুমণ্ডলের ঘনত্বের পার্থক্য উড্ডয়নের পুরো প্রক্রিয়াকেই বদলে দেয়। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় অত্যন্ত পাতলা। এর ঘনত্ব পৃথিবীর মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। ফলে সেখানে কোনো উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টারকে স্থিতিশীলভাবে উড়ানো প্রযুক্তিগতভাবে খুবই জটিল একটি বিষয়।
নতুন হেলিকপ্টারের রোটর ব্লেডের গতি বাড়ানোর ফলে এর উড্ডয়ন ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নাসার হিসাব অনুযায়ী, নতুন মডেলের হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন সক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানে আরও ভারী এবং উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বহন করা সম্ভব হবে।
গবেষকেরা মনে করছেন, এ ধরনের হেলিকপ্টার মঙ্গলের দুর্গম অঞ্চল থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। যেসব জায়গায় রোভার বা অন্যান্য যান সহজে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে এই হেলিকপ্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মঙ্গলের ভূপ্রকৃতি, বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশ নিয়ে আরও গভীর গবেষণার পথও খুলে যাবে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘স্কাইফল’ মিশনের অংশ হিসেবে ২০২৮ সালের শেষ দিকে নতুন প্রজন্মের তিনটি হেলিকপ্টার মঙ্গল গ্রহে পাঠানো হবে। এই মিশনের মাধ্যমে মঙ্গলের বিস্তৃত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির বাস্তব কার্যকারিতাও যাচাই করা হবে।
মঙ্গল অভিযানে নাসার এই নতুন পদক্ষেপকে মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট আকারের হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী এই হেলিকপ্টার ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধানকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করে তুলতে পারে।





Add comment