পা ফোলা অবহেলা নয়, হতে পারে লিম্ফেডেমা

শরীরের কোনো অংশ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেলে অনেকেই সেটিকে সাধারণ সমস্যা বলে এড়িয়ে যান। বিশেষ করে হাত বা পা ফুলে গেলে অনেকে ভাবেন এটি হয়তো সাময়িক ক্লান্তি, পানি জমা বা অন্য কোনো ছোটখাটো শারীরিক সমস্যার ফল। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এমন ফোলা অনেক সময় ‘লিম্ফেডেমা’ নামের জটিল সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতার কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লিম্ফেডেমা হলো এমন একটি অবস্থা, যখন শরীরের লসিকা বা লিম্ফ নামের স্বচ্ছ তরল স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে না এবং নির্দিষ্ট স্থানে জমে যায়। ফলে ধীরে ধীরে হাত, পা বা শরীরের অন্য অংশ ফুলে ওঠে। সাধারণত লসিকানালির মাধ্যমে শরীরের অতিরিক্ত তরল, প্রোটিন ও জীবাণু নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু এই প্রবাহে বাধা তৈরি হলে টিস্যুর ভেতরে তরল জমতে শুরু করে এবং দেখা দেয় লিম্ফেডেমা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যা জন্মগতভাবেও হতে পারে আবার পরবর্তী জীবনেও বিভিন্ন কারণে দেখা দিতে পারে। কারও কারও শরীরে জন্ম থেকেই লসিকানালি দুর্বল বা কম থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে ধীরে ধীরে হাত বা পা ফুলতে শুরু করে।

আবার অনেক সময় ক্যানসারের চিকিৎসার অংশ হিসেবে অস্ত্রোপচার করে লসিকাগ্রন্থি অপসারণ করতে হয়। বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের রোগীদের ক্ষেত্রে বগলের লসিকাগ্রন্থি কেটে ফেলার পর হাত ফুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া রেডিওথেরাপির প্রভাবেও লসিকাপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বারবার সংক্রমণ, বিশেষ করে ফাইলেরিয়াসিস, বড় ধরনের আঘাত অথবা দীর্ঘদিন শরীরের কোনো অংশ অচল থাকলেও লিম্ফেডেমা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় রোগীরা প্রথমদিকে বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। কারণ ফোলাভাব ধীরে ধীরে বাড়ে।

এই রোগের সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে হাত বা পা ভারী লাগা, টান টান অনুভূতি, ত্বক মোটা বা শক্ত হয়ে যাওয়া এবং আঙুলে আংটি বা জুতা টাইট হয়ে যাওয়া। প্রথমদিকে ফোলা অংশে চাপ দিলে দাগ পড়ে থাকতে পারে, তবে পরে তা শক্ত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থানে বারবার সংক্রমণও দেখা দেয়। ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, গরম লাগা কিংবা ব্যথা অনুভূত হওয়াও লিম্ফেডেমার লক্ষণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগের চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, ফল তত ভালো হয়। দীর্ঘ সময় অবহেলা করলে শরীরে স্থায়ী পরিবর্তন তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

লিম্ফেডেমার চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ফোলা কমানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর একটি হলো কমপ্রেশন থেরাপি। এতে ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ, কমপ্রেশন স্লিভ বা বিশেষ লম্বা মোজা ব্যবহার করা হয়। সাধারণত সকালে এগুলো পরতে হয় এবং নিয়মিত ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সঠিক মাপ অনুযায়ী ব্যবহার না করলে উপকারের বদলে ক্ষতি হতে পারে।

চিকিৎসকেরা আরও জানান, কমপ্রেশন ব্যবহারের পাশাপাশি হালকা ও নিয়মিত ব্যায়াম করলে লসিকার চলাচল বাড়ে। হাত ওপরে তুলে ধীরে নামানো, গোড়ালি নড়ানো কিংবা হালকা হাঁটার মতো ব্যায়াম এতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো ব্যায়ামই জোর করে করা উচিত নয়।

এ ছাড়া বিশেষ ধরনের ম্যাসাজও লিম্ফেডেমা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রশিক্ষিত থেরাপিস্ট হালকা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে জমে থাকা লিম্ফ তরলকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। এটি সাধারণত ব্যথাহীন পদ্ধতি।

ত্বকের যত্নও এ রোগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার ও শুকনা রাখা প্রয়োজন। কাটা-ছেঁড়া, মশা বা পোকামাকড়ের কামড় থেকে সাবধান থাকতে হয়। কারণ সামান্য সংক্রমণও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, অতিরিক্ত ওজন লিম্ফেডেমা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সুষম খাদ্য গ্রহণ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। কিছু জটিল ক্ষেত্রে নিউম্যাটিক কমপ্রেশন পাম্প বা বিশেষ ধরনের অস্ত্রোপচারও বিবেচনা করা হয়। তবে এসব পদ্ধতি সব রোগীর জন্য প্রযোজ্য নয়।

দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস মেনে চললে লিম্ফেডেমা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে। আক্রান্ত হাত বা পা উঁচু করে বিশ্রাম নেওয়া, দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে না থাকা, ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা উপকারী। পাশাপাশি আক্রান্ত হাতে রক্তচাপ না মাপা, ইনজেকশন বা স্যালাইন না দেওয়া এবং ভারী জিনিস না তোলার পরামর্শও দেন বিশেষজ্ঞরা। অতিরিক্ত গরম সেঁক ব্যবহার করাও এড়িয়ে চলতে বলা হয়।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed