আদানি মামলা নিষ্পত্তি ঘিরে নতুন বিতর্ক

ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এবং তাঁর ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আনা সব ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে নিউইয়র্কের আলোচিত এই সিকিউরিটিজ ও ওয়্যার ফ্রড মামলাটি স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পৃথক তদন্তও সমাপ্ত হয়েছে বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে মার্কিন কর্তৃপক্ষ গত সোমবার আদানির বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগ খারিজের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পাশাপাশি আদানি এন্টারপ্রাইজেসের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ সম্পর্কিত বিষয়টিও সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান একাধিক আইনি প্রক্রিয়া একযোগে বন্ধ হয়ে যায়।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানির আইনজীবী ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আইনজীবী রবার্ট জিউফ্রা জুনিয়র একটি উপস্থাপনায় দাবি করেন, আদানি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তবে মামলার কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এই প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভারতের একটি বৃহৎ সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রকল্পের অনুমোদন পেতে আদানি গ্রুপ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে আদানি গ্রুপ শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

এর পাশাপাশি আদানি এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড (AEL) যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের অধীনস্থ অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC)-এর সঙ্গে একটি পৃথক সমঝোতায় পৌঁছায়। অভিযোগ ছিল, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে জ্বালানি কেনার মাধ্যমে কোম্পানিটি নিয়ম ভঙ্গ করেছে। সমঝোতা অনুযায়ী, কোম্পানিটি ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা দিতে রাজি হয়েছে।

ওএফএসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আদানি এন্টারপ্রাইজেস অভিযোগ স্বীকার না করেই এই অর্থ পরিশোধের চুক্তিতে পৌঁছেছে। এটি সংস্থাটির সঙ্গে তাদের দ্বিতীয় ধরনের সমঝোতা। যদিও সর্বোচ্চ জরিমানা ৩৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারত, তবে তদন্তে সহযোগিতা এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপের কারণে জরিমানার পরিমাণ কমানো হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দুবাইভিত্তিক এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এলপিজি আমদানি করে আদানি এন্টারপ্রাইজেস। ওই ব্যবসায়ী দাবি করেছিল, সে ওমান ও ইরাক থেকে গ্যাস সরবরাহ করছে। তবে বিভিন্ন সতর্ক সংকেতের পরও ধারণা করা হয় যে, ওই জ্বালানির একটি অংশ ইরান থেকে আসতে পারে।

ওএফএসির তদন্তে আরও বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে অন্তত চারটি ভিন্ন ঘটনায় কোম্পানিকে জানানো হয়েছিল যে, সরবরাহকৃত জ্বালানির উৎস ইরান হতে পারে। এরপরও সংশ্লিষ্ট লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার কারণে বিষয়টি গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। মোট ৩২টি কিস্তিতে প্রায় ১৯ কোটি ২১ লাখ ডলারের অর্থ মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়।

তবে তদন্ত সংস্থা এটিও উল্লেখ করেছে যে, আদানি এন্টারপ্রাইজেস পরবর্তীতে তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করেছে এবং দ্রুত একটি স্বাধীন অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিবর্তন, এলপিজি আমদানি স্থগিত এবং অভ্যন্তরীণ কমপ্লায়েন্স নীতিমালা শক্তিশালী করার মতো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) গৌতম আদানি ও সাগর আদানির বিরুদ্ধে আলাদা মামলায় চূড়ান্ত রায় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ ছিল, ২০২১ সালে আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের বন্ড ইস্যুর সময় মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আদালত অনুমোদন দিলে উভয়কে যথাক্রমে ৬০ লাখ ও ১ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানা গুনতে হতে পারে।

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর থেকেও জানানো হয়েছে, আগামী তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনসহ বিভিন্ন বাজারে বড় অঙ্কের কৃষিপণ্য বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যার অংশ হিসেবে এই কর্পোরেট সমঝোতাগুলোর প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে একাধিক মামলা ও তদন্ত একযোগে নিষ্পত্তি হলেও আদানি গ্রুপকে ঘিরে থাকা বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নীতিগত প্রশ্ন এখনো গুরুত্ব হারায়নি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed