মুক্তির এক মাস পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে এখনো আলোচনায় রয়েছে সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’। ২৪৮ মিলিয়ন ডলার বাজেটের এই সিনেমা ইতিমধ্যে আয় করেছে ৬৪১ মিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমা হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে এটি। শুরুতে খুব বেশি আলোচনায় না থাকলেও ধীরে ধীরে দর্শকদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সিনেমাটি। সেই কারণেই একে বলা হচ্ছে ‘স্লিপার হিট’।
অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজের ব্যানারে নির্মিত এই সিনেমা এখন পর্যন্ত স্টুডিওটির সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্র হিসেবেও রেকর্ড গড়েছে। রায়ান গসলিং অভিনীত ছবিটি কেন দর্শকদের এতটা আকৃষ্ট করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন আলোচনা চলছে চলচ্চিত্র অঙ্গনে।
ফিল লর্ড ও ক্রিস্টোফার মিলার পরিচালিত এই সিনেমার গল্প শুরু হয় মহাকাশযানে ঘুম ভাঙার মধ্য দিয়ে। জেগে ওঠেন গ্রেস নামের এক ব্যক্তি। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন গসলিং। তিনি বুঝতে পারেন, সাময়িকভাবে নিজের স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছেন। মহাকাশযানে থাকা একটি রোবটের কণ্ঠ তাঁকে জানায় এই তথ্য। এরপর ধীরে ধীরে তিনি জানতে চেষ্টা করেন, কেন তিনি সেখানে আছেন।
অসরলরৈখিক বর্ণনায় এগিয়ে যায় সিনেমার গল্প। বর্তমানের মহাকাশযাত্রা এবং অতীতের পৃথিবীর ঘটনা সমান্তরালে দেখানো হয়েছে। ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে জানা যায়, গ্রেস একসময় মলিকুলার বায়োলজিস্ট ছিলেন, যদিও পরে তিনি হাইস্কুল শিক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন।
গল্পের মোড় ঘুরে যায় যখন পৃথিবী ভয়াবহ এক সংকটের মুখে পড়ে। সূর্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে রহস্যময় সংক্রমণ ‘অ্যাস্ট্রোফেজ’। এর ফলে ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে সূর্যের আলো। আশঙ্কা তৈরি হয়, কয়েক বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। মানবজাতিকে রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে নাসা শুরু করে ‘হেইল মেরি’ মিশন।
এই মিশনের অংশ হিসেবেই মহাকাশে যান গ্রেস। কিন্তু তাঁর সঙ্গে থাকা দুই সহযাত্রী ইতিমধ্যে মারা গেছেন। কীভাবে মহাকাশযান পরিচালনা করতে হবে, সেটাও পুরোপুরি জানেন না তিনি। এই অসহায় অবস্থার মধ্যেই গল্প নতুন দিকে মোড় নেয়। পরিচয় ঘটে এক ভিনগ্রহের প্রাণীর সঙ্গে। এরপর শুরু হয় পৃথিবীকে রক্ষার আরেক সংগ্রাম।
সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে অ্যান্ডি উইয়ারের একই নামের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে। এর আগে তাঁর লেখা থেকে তৈরি হয়েছিল আলোচিত সিনেমা ‘দ্য মার্শিয়ান’। বিজ্ঞান, আবেগ, হাস্যরস এবং মানবিক টানাপোড়েনকে একসঙ্গে পর্দায় তুলে ধরেছেন নির্মাতারা। বইয়ের মূল কাঠামোও অনেকটাই অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে।
বিশেষ করে মহাকাশে গ্রেসের একাকিত্ব এবং পৃথিবীর সংকটকে যেভাবে পাশাপাশি দেখানো হয়েছে, তা দর্শকদের মধ্যে টানটান আগ্রহ ধরে রাখে। সিনেমার অন্যতম বড় শক্তি হয়ে উঠেছে গসলিংয়ের অভিনয়। একাধিক দীর্ঘ একক দৃশ্যে তিনি পুরো সিনেমাকে নিজের কাঁধে বহন করেছেন।
গসলিং নিজেও জানিয়েছেন, বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পের সঙ্গে হাস্যরসের মিশ্রণ তাঁকে এই সিনেমায় কাজ করতে আগ্রহী করেছে। তাঁর মতে, কঠিন বৈজ্ঞানিক বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করতে হাস্যরস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিনেমাটিতেও বিজ্ঞানকে কেবল প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, মূল গল্প মানবিকতার।
তবে সমালোচনার জায়গাও রয়েছে। ২ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের সিনেমাটি অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ মনে হয়েছে। কিছু দৃশ্যকে টেনে নেওয়া হয়েছে বলেও মত দিয়েছেন সমালোচকেরা। অনেকের মতে, সিনেমাটিতে ‘ইন্টারস্টেলার’-এর প্রভাবও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
মহাকাশের বিশালতা দেখাতে গিয়ে নির্মাতারা কখনো কখনো অতিরিক্ত ভিজ্যুয়াল ও উচ্চ সাউন্ড ব্যবহার করেছেন, যা দর্শকের স্বাভাবিক বিস্ময়কে কিছুটা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে কিছু আবেগঘন দৃশ্য অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত মনে হয়েছে।
তবু সিনেমার প্রাণ হয়ে উঠেছে গ্রেস এবং ভিনগ্রহের প্রাণী রকির বন্ধুত্ব। এই সম্পর্কের মধ্যেই গল্পের আবেগ সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে। কমেডির জায়গাগুলোতেও গসলিং ছিলেন দুর্দান্ত স্বাভাবিক।
স্বল্প সময়ের উপস্থিতিতেও ইভা চরিত্রে নজর কেড়েছেন হুলার। পুরো মিশনের গুরুত্ব ও চাপ তিনি দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছেন। অন্যদিকে ছোট চরিত্র হলেও বয়েসের অভিনয় গল্পে আলাদা প্রাণ যোগ করেছে।
চিত্রগ্রাহক, ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট এবং আবহসংগীতও সিনেমাটির বড় শক্তি। মহাকাশের শূন্যতা, নিঃসঙ্গতা এবং অনিশ্চয়তাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে পর্দায়। পপ-রক, ফোক ও কান্ট্রি ঘরানার আবহসংগীত সিনেমার আবেগকে আরও গভীর করেছে।
সব মিলিয়ে ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ এমন এক সিনেমা, যা বক্স অফিসে বড় সাফল্য পেয়েছে এবং দর্শকদের বিনোদন দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে সময়ের পরীক্ষায় এটি কতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে, সেই প্রশ্ন এখনো থেকেই যাচ্ছে।





Add comment