বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র আসর কান চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে জাপানের তিনটি সিনেমা। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিষয়টি ইতিমধ্যেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জাপানি নির্মাতা কোরে-এদার নতুন ছবি ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ নিয়ে কৌতূহল সবচেয়ে বেশি। মানবসদৃশ রোবট ও মানুষের আবেগঘন সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমাকে এবারের উৎসবের অন্যতম আলোচিত কাজ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবছরই কান চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্ব সিনেমার জন্য নতুন বার্তা নিয়ে আসে। এখানে নির্বাচিত হওয়া কিংবা পুরস্কার জেতা মানেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়া। শুধু চলচ্চিত্রপ্রেমী নয়, সমালোচক ও সংবাদমাধ্যমের নজরও থাকে এই উৎসবের দিকে। কারণ অনেক সময় এখান থেকেই সিনেমার ভাষা, নির্মাণশৈলী কিংবা গল্প বলার ধরনে নতুন ধারা তৈরি হয়।
এবারের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে মোট ২২টি সিনেমা জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যেই কোরে-এদার ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ নিয়ে আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। ছবিটির কাহিনিতে উঠে এসেছে এক দম্পতির জীবনের গল্প। অকালেই সন্তান হারানোর পর তারা সন্তানের আদলে একটি মানবসদৃশ রোবট তৈরি করে। এরপর যন্ত্র ও মানুষের আবেগ, স্মৃতি, শূন্যতা এবং সম্পর্কের জটিল বাস্তবতা ধীরে ধীরে সামনে আসে।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে হিউমেনয়েড রোবট নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগিয়ে চলছে। বিশেষ করে চীন এই প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে আয়োজিত এক ব্যতিক্রমী হাফ ম্যারাথনে মানুষের পাশাপাশি হিউমেনয়েড রোবট অংশ নেয়। সেখানে ‘লাইটনিং’ নামের একটি রোবট ২১ কিলোমিটার পথ শেষ করে ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে। এই আয়োজন দেখিয়েছে, মানব আকৃতির রোবট প্রযুক্তি কত দ্রুত বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।
তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বাইরে শিল্প ও সংস্কৃতিতে এই রোবটের মানবিক দিক খুব কমই উঠে এসেছে। সেই জায়গাটিকেই সিনেমার ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কোরে-এদা। ছবিটির চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি নিজেই। ফলে সিনেমাটি শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়, বরং মানুষ ও আবেগের গভীর সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এটি মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হওয়া কোরে-এদার অষ্টম সিনেমা। এর আগে ২০১৮ সালে তাঁর ‘শপলিফটার্স’ কান উৎসবের সর্বোচ্চ সম্মান পাম দ’র জিতেছিল। ফলে এবারের উৎসবেও তাঁর নতুন কাজ ঘিরে প্রত্যাশা অনেক বেশি।
এবারের আসরে জাপানের আরেক আলোচিত নির্মাতা হামাগুচিও ফিরছেন মূল প্রতিযোগিতায়। তাঁর নতুন সিনেমা ‘অল অব আ সাডেন’–এ দেখা যাবে প্যারিসের একটি নার্সিং হোমে ক্যানসারে আক্রান্ত এক জাপানি নারী এবং সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নারীর সম্পর্কের গল্প। মানবিক আবেগ ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম উপস্থাপনার জন্য এই নির্মাতা আগেও প্রশংসা পেয়েছেন।
এর আগে ২০২১ সালে তাঁর ‘ড্রাইভ মাই কার’ কানের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের ছবিটিও আন্তর্জাতিক দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা পাওয়া তৃতীয় জাপানি সিনেমাটি হলো ফুকাদার ‘নাগি নোটস’। দেশের তিন শীর্ষ পরিচালকের সিনেমা একসঙ্গে মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা পাওয়ায় জাপানের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। দেশটির সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে।
শুধু মূল প্রতিযোগিতাই নয়, কানের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতাতেও জায়গা পেয়েছে জাপানের আরও একটি সিনেমা। সোদের ‘অল দ্য লাভার্স ইন দ্য নাইট’ সেখানে প্রদর্শিত হবে। পাশাপাশি কুরোসাওয়ার নতুন ছবি ‘কোকুরোজো’ দেখানো হবে কানের ‘প্রিমিয়ার’ বিভাগে। আন্তর্জাতিকভাবে ছবিটির ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ‘সামুরাই অ্যান্ড দ্য প্রিজনার’।
চলতি মাসের ১২ তারিখ থেকে শুরু হতে যাওয়া এই উৎসব ঘিরে ইতিমধ্যেই জাপানি সিনেমাপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এবারের কান উৎসব জাপানি চলচ্চিত্রের জন্য নতুন এক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।





Add comment