ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের প্রভাব যখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে, ঠিক সেই সময় প্রত্যাশার তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে চীনের অর্থনীতি। জ্বালানিসংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশটি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে অর্থনীতিবিদেরা যেখানে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, সেখানে বাস্তব চিত্র সেই অনুমানকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স প্রত্যাশার তুলনায় শক্তিশালী বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়ে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। অনেক দেশ জ্বালানিসংকটে পড়লেও তুলনামূলকভাবে চীন পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে।
প্রথম প্রান্তিকের এই প্রবৃদ্ধির তথ্য এমন সময়ে এসেছে, যখন বেইজিং সম্প্রতি তাদের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। ১৯৯১ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন লক্ষ্যমাত্রা। এর আগের প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে চার শতাংশ, যা এবার কিছুটা বেড়েছে মূলত উৎপাদন খাতের ইতিবাচক অবদানের কারণে। তবে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক বিশ্লেষকের মতে, গাড়ি ও অন্যান্য রপ্তানি খাত প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পূর্ণ প্রভাব এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটার কারণে আগামী প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
মার্চ মাসে নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় জিডিপি লক্ষ্যসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই পরিকল্পনায় উচ্চপ্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দেশটির শাসক দল অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দুর্বল ভোগব্যয়, জনসংখ্যা হ্রাস এবং দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকটকে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যেখানে জ্বালানিসংকট, বাণিজ্যিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক বড় ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। তবে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের প্রধান জানিয়েছেন, জুলাইয়ের শুরুতে এই শুল্ক আবার বাড়তে পারে। এদিকে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে মে মাসে বৈঠকের সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
মার্চ মাসের রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়ায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত মাসে রপ্তানি প্রায় আড়াই শতাংশ কমে, যা ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। যদিও জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ২০ শতাংশ বেড়েছিল, মূলত ইলেকট্রনিকস ও উৎপাদিত পণ্যের উচ্চ চাহিদার কারণে।
লুনার নিউ ইয়ারের সময় পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর প্রথম দুই মাসের বাণিজ্য তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে মার্চে আমদানি প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নেমে এসেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারে, যা এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এক অর্থনীতিবিদের মতে, বৈশ্বিক ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানির খরচ বেড়েছে, যার পেছনে ইরানসংকট বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থার কারণে অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর চীনের নির্ভরতা তুলনামূলক কম, তবুও দেশটিতে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং কিছু এয়ারলাইন জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফ্লাইট কমাতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিকভাবে পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে ভোক্তাদের ব্যয় কমে যেতে পারে, যা সরাসরি চীনের রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অনেকটাই নির্ভর করে বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর, এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সহজ নয়।





Add comment