সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে একটি বিশাল গ্রহাণু চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি দেখা যেতে পারে পৃথিবী থেকে। পৃথিবী তার নিজ কক্ষপথে চলতে চলতে এই ধ্বংসাবশেষের মেঘের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, ফলে আকাশে উল্কাবৃষ্টি হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে এসব কণার জ্বলন্ত উপস্থিতি। ইতোমধ্যে গবেষকেরা ২৮২টি শুটিং স্টার বা উল্কার একটি গুচ্ছ শনাক্ত করেছেন, যা মহাকাশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই পাথুরে ধ্বংসাবশেষের স্তূপটি আসলে একটি মৃতপ্রায় গ্রহাণুর অবশিষ্টাংশ, যা সূর্যের অত্যন্ত কাছে চলে যাওয়ার কারণে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এই ধরনের বস্তু সাধারণ গ্রহাণুর মতো হলেও এর আচরণ অনেকটা ধূমকেতুর মতো, যা একে বিশেষভাবে আলাদা করে তুলেছে।
নতুন এই পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের এক বিজ্ঞানী জানান, এই আবিষ্কার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, মূলত একটি লুকানো গ্রহাণুকে সূর্যের তাপে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই অসংখ্য ক্ষুদ্র মহাকাশ শিলা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এবং ঘর্ষণের ফলে পুড়ে গিয়ে উল্কায় পরিণত হয়। যখন এসব কণা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫ মাইল বা তারও বেশি গতিতে বায়ুমণ্ডলের অণুর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন তাদের বাইরের স্তর দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত গ্যাসে রূপ নেয়। এই গ্যাস উজ্জ্বল আলো তৈরি করে, যা খালি চোখে দেখা সম্ভব হয়।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, সৌরজগতজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ক্ষুদ্র কণাগুলোর বেশিরভাগই ধূমকেতু বা গ্রহাণুর ভাঙনের ফল। যখন গবেষকেরা এসব সক্রিয় মহাজাগতিক বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করতে চান, তখন তারা সাধারণত ধূমকেতুর উজ্জ্বল লেজ খোঁজেন বা তাদের ফেলে যাওয়া ধ্বংসাবশেষের কারণে সৃষ্ট উল্কাবৃষ্টি বিশ্লেষণ করেন।
উল্লেখিত গবেষক এই নির্দিষ্ট উল্কাগুচ্ছটি বিশ্লেষণ করে এর উৎস পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন। এই উল্কাবৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একটি বিরল ধরনের মহাজাগতিক বস্তু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যাকে রক-কমেট বলা হয়। সাধারণত অধিকাংশ উল্কাবৃষ্টি ধূমকেতু থেকে আসে। ধূমকেতু সূর্যের কাছে পৌঁছালে তাদের বরফ সরাসরি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে গ্রহাণুগুলো প্রধানত পাথুরে প্রকৃতির। তবে কোনো শুষ্ক পাথুরে গ্রহাণু যদি সূর্যের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে যায় বা প্রবল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মুখে পড়ে, তাহলে সেটিও ধূমকেতুর মতো আচরণ করে এবং ধুলাবালু ছড়িয়ে ভেঙে যেতে পারে।
এই উল্কাগুলোর গঠন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন, এগুলো মাঝারি মাত্রায় ভঙ্গুর হলেও ধূমকেতুর উপাদানের তুলনায় কিছুটা শক্ত। এই তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সূর্যের তীব্র তাপ গ্রহাণুর পৃষ্ঠকে ফাটিয়ে দিচ্ছে এবং এর ভেতরে আটকে থাকা গ্যাসগুলো বের করে দিয়ে পুরো কাঠামোকে ধ্বংস করে ফেলছে। গ্রহাণুটির এমন নাটকীয় আত্মবিধ্বংসী আচরণের পেছনে এর অস্বাভাবিক কক্ষপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের প্রায় পাঁচ গুণ বেশি কাছাকাছি পৌঁছে যায়, ফলে তাপমাত্রা ও চাপের প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
প্রসঙ্গত, মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা ধূলিকণা ও ক্ষুদ্র পাথরের মেঘের মধ্য দিয়ে পৃথিবী যখন অতিক্রম করে, তখন সেসব কণা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে ঘর্ষণের কারণে জ্বলে ওঠে। এই দৃশ্যই আমরা উল্কাবৃষ্টি হিসেবে দেখি। গবেষকেরা এই নতুন উল্কাবৃষ্টির নাম দিয়েছেন এম২০২৬–এ১। জানা গেছে, প্রতিবছর ১৬ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত এই উল্কাবৃষ্টি আকাশে দৃশ্যমান হবে।





Add comment