বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটার যেন দৈনন্দিন কাজের অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পেশাজীবী, প্রায় সবাই দীর্ঘ সময় ধরে এসব ডিভাইস ব্যবহার করছেন। তবে সঠিক ভঙ্গি বজায় না রেখে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে চোখ রাখার অভ্যাস ধীরে ধীরে তৈরি করছে একটি নতুন ধরনের শারীরিক সমস্যা, যার নাম ‘টেক্সট নেক’। এটি এখন ঘাড়ব্যথার একটি সাধারণ হলেও উদ্বেগজনক কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মাথার ওজন প্রায় ৪ থেকে ৫ কেজি। কিন্তু যখন কেউ মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, তখন ঘাড়ের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথা যদি ৪৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে থাকে, তাহলে ঘাড়ের ওপর কার্যকর চাপ ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ঘাড়ের পেশি, লিগামেন্ট, ডিস্ক এবং জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।
এই অস্বাভাবিক চাপ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। পেশিতে টান, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, কাঁধ ও পিঠের ওপরের অংশে জ্বালাপোড়া অনুভূতি, মাথাব্যথা এবং ঘাড়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যাওয়া এসব সমস্যার মধ্যে অন্যতম। অনেক ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ ধীরে ধীরে তীব্র আকার ধারণ করে।
গুরুতর পরিস্থিতিতে এই সমস্যা আরও জটিল রূপ নিতে পারে। যেমন সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস, যেখানে ঘাড়ের হাড় ও ডিস্ক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এছাড়াও নার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া বা হাড়ের প্রান্তে অতিরিক্ত হাড়ের অংশ গজিয়ে ওঠার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এই ব্যথা ঘাড় থেকে ছড়িয়ে কাঁধ কিংবা হাতে পর্যন্ত পৌঁছায়, যা দৈনন্দিন কাজকর্মে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
টেক্সট নেকের সাধারণ কিছু লক্ষণ রয়েছে, যা শুরুতেই শনাক্ত করা জরুরি। এর মধ্যে ঘাড়ে স্থায়ী ব্যথা ও শক্তভাব, কাঁধ ও পিঠের ওপরের অংশে অস্বস্তি, মাথার পেছনে ব্যথা, হাতে ঝিনঝিন ভাব বা অবশ অনুভূতি এবং শরীরের ভঙ্গিতে পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে সামনে ঝুঁকে থাকা মাথা ও কাঁধ এই সমস্যার দৃশ্যমান লক্ষণ হিসেবে ধরা পড়ে। এসব উপসর্গ অবহেলা করলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তন অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। প্রথমত, ডিভাইস ব্যবহারের সময় সঠিক ভঙ্গি বজায় রাখা জরুরি। মোবাইল ফোন চোখের সমতলে ধরে ব্যবহার করা এবং কম্পিউটার বা ল্যাপটপের স্ক্রিন চোখের সমান উচ্চতায় রাখা উচিত। এতে ঘাড়ের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমে।
এছাড়া দীর্ঘ সময় একটানা কাজ না করে নিয়মিত বিরতি নেওয়া প্রয়োজন। প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিনিট পরপর ঘাড় ও কাঁধ হালকা নাড়াচাড়া করলে পেশি স্বাভাবিক থাকে। সঠিক চেয়ার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। এমন চেয়ারে বসা উচিত যেখানে পিঠ সোজা রাখা যায় এবং কোমরের জন্য পর্যাপ্ত সাপোর্ট থাকে।
অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমানোও প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম করে ঘাড় ও কাঁধের পেশি শক্তিশালী রাখা উচিত। এতে ভবিষ্যতে এই ধরনের সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
যদি ইতোমধ্যে ঘাড়ে ব্যথা শুরু হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, কাজের ধরনে পরিবর্তন আনা এবং গরম সেঁক দেওয়া পেশি শিথিল করতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে সঠিক ভঙ্গি প্রশিক্ষণ, ম্যানুয়াল থেরাপি, স্ট্রেচিং এবং শক্তিবর্ধক ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা রাখে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শুধুমাত্র ব্যথানাশক ওষুধের ওপর নির্ভর না করে সমস্যার মূল কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





Add comment