আলোর ভেতরেই মিলল গতির নতুন রহস্য

পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এমন এক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেখানে আলোর ভেতরের অন্ধকার বিন্দু বা গর্ত আলোর গতিকেও অতিক্রম করতে সক্ষম। এই বিশেষ ঘটনাকে বলা হয় ফেজ সিঙ্গুলারিটি বা অপটিক্যাল ভর্টেক্স। বহুদিন ধরেই গবেষকদের মধ্যে ধারণা ছিল, যেমন নদীর পানির ঘূর্ণি কখনো কখনো স্রোতের গতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, তেমনি আলোর ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক এই পর্যবেক্ষণ সেই ধারণাকেই বাস্তব রূপ দিয়েছে।

তবে এই আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, আপেক্ষিকতা তত্ত্বের কোনো বিরোধ সৃষ্টি করে না। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো বস্তু বা তথ্য আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। কিন্তু এখানে যে ঘূর্ণির কথা বলা হচ্ছে, তার কোনো ভর নেই এবং এটি কোনো তথ্যও বহন করে না। ফলে এর গতি মূলত তরঙ্গের গঠনগত পরিবর্তনের ফলাফল, কোনো বাস্তব বস্তুর স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়।

আলো একদিকে কণার মতো আচরণ করে, অন্যদিকে তরঙ্গ হিসেবেও কাজ করে। যখন এই আলোর তরঙ্গ চলার সময় স্ক্রুর মতো পাক খেতে খেতে অগ্রসর হয়, তখন তাকে অপটিক্যাল ভর্টেক্স বলা হয়। এই ঘূর্ণির কেন্দ্রস্থলে এমন একটি বিন্দু তৈরি হয়, যেখানে আলোর তরঙ্গগুলো একে অপরকে বাতিল করে দেয়। ফলে সেখানে আলো অনুপস্থিত থাকে এবং একটি অন্ধকার গর্তের সৃষ্টি হয়।

গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যখন বিপরীত চার্জবিশিষ্ট দুটি সিঙ্গুলারিটি একে অপরের কাছাকাছি আসে, তখন তারা একে অপরকে আকর্ষণ করতে শুরু করে। এই আকর্ষণের ফলে তাদের গতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। একেবারে মিলনের আগমুহূর্তে এই গতি এতটাই বেড়ে যায় যে তা শূন্যস্থানে আলোর গতিকেও ছাড়িয়ে যায়। তবে এই অবস্থা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী এবং খুব সূক্ষ্ম পরিসরে ঘটে।

এই ধরনের দ্রুতগতির ক্ষুদ্র ঘটনাকে সাধারণ ক্যামেরা দিয়ে ধারণ করা সম্ভব নয়। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে গবেষক দল বিশেষ একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। তারা হেক্সাগোনাল বোরন নাইট্রাইড নামের একটি দ্বিমাত্রিক পদার্থ প্রয়োগ করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে আলো এবং আণবিক কম্পনের সমন্বয়ে ফোনন পোলারাইটন নামের একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়। এটি সাধারণ আলোর তুলনায় অনেক ধীরগতিতে চলে, ফলে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয়।

গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে একটি উন্নতমানের উচ্চগতির ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ, যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময়ের ঘটনাও রেকর্ড করতে সক্ষম। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সংগৃহীত শত শত আলাদা আলাদা ছবি একত্র করে গবেষকেরা একটি টাইম ল্যাপস তৈরি করেছেন। সেখানে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, কীভাবে ভর্টেক্সগুলো একে অপরের দিকে ধাবিত হওয়ার সময় ক্ষণিকের জন্য অতিলৌকিক গতিতে পৌঁছে যায়।

এই আবিষ্কার কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এর সম্ভাবনা ব্যাপক। বিশেষ করে ন্যানো স্কেলে বিভিন্ন কণার গতিবিধি বোঝার ক্ষেত্রে এটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। গবেষণা দলের নেতৃত্বে থাকা পদার্থবিদ জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রকৃতির সবচেয়ে দ্রুত ও জটিল মুহূর্তগুলো পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের অনেক অজানা রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হতে পারে।

উল্লেখ্য, এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি বিশ্বখ্যাত নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যা এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্বকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed