বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজারে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের আইফোন। জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়কালে বৈশ্বিক বাজারের ২১ শতাংশ দখলে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলেছে। গত বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ১৯ শতাংশ, অর্থাৎ এক বছরে তাদের বাজার হিস্যায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বৈশ্বিক স্মার্টফোন সরবরাহ প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। তবুও এই সংকুচিত বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে অ্যাপল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরে প্রতিষ্ঠানটির স্মার্টফোন সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল, যার ফলে ২০২৫ সালে তাদের বাজার হিস্যা দাঁড়ায় ২০ শতাংশে। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি ব্র্যান্ড স্যামসাংয়ের দখলে ছিল ১৯ শতাংশ বাজার। এর মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে বেশি স্মার্টফোন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে শীর্ষে উঠে আসে অ্যাপল।
নতুন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আইফোনের সরবরাহ আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে, অন্যান্য শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে সরবরাহে পতন লক্ষ্য করা গেছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আইফোনের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বাজার হিস্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে স্যামসাং, যারা ২০ শতাংশ শেয়ার ধরে রেখেছে। যদিও জানুয়ারি-মার্চ সময়ে তাদের স্মার্টফোন সরবরাহ প্রায় ৬ শতাংশ কমে গেছে। অর্থাৎ বাজারে অবস্থান ধরে রাখলেও সরবরাহের দিক থেকে কিছুটা চাপের মুখে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চীনা ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। শাওমির বাজার হিস্যা ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশে। একই সঙ্গে তাদের সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ, যা শীর্ষ পাঁচ ব্র্যান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। অন্যদিকে অপ্পো ও ভিভোর বাজার হিস্যা যথাক্রমে ১১ ও ৮ শতাংশে অবস্থান করছে। অপ্পোর শেয়ার অপরিবর্তিত থাকলেও তাদের সরবরাহ ৪ শতাংশ কমেছে। ভিভোর ক্ষেত্রে বাজার হিস্যা ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে, তবে সরবরাহ কমেছে ২ শতাংশ।
শীর্ষ পাঁচ ব্র্যান্ডের বাইরে থাকা অন্যান্য স্মার্টফোন নির্মাতাদের হাতে বর্তমানে ২৮ শতাংশ বাজার রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। এই অংশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহও কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজার নানা চাপে ছিল। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে মেমোরি চিপের ঘাটতি, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। বিশেষ করে র্যাম ও স্টোরেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ সীমিত হওয়ায় কোম্পানিগুলোকে তাদের উৎপাদন ও মূল্য নির্ধারণ কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
এ ছাড়া জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাজনিত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে। ফলে অনেকেই নতুন ডিভাইস কেনা থেকে বিরত থেকেছেন। এর ফলে সংস্কার করা বা রিফার্বিশড স্মার্টফোনের চাহিদা বেড়েছে, যা নতুন ডিভাইসের বাজারকে আরও চাপে ফেলেছে।
একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বলেন, বর্তমানে মেমোরি নির্মাতারা ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে স্মার্টফোন নির্মাতারা পর্যাপ্ত উপাদান পাচ্ছে না। এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কম ও মধ্যম দামের স্মার্টফোনের বাজারে।
অন্যদিকে প্রিমিয়াম ডিভাইস নির্মাতারা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও ভলিউমনির্ভর চীনা ব্র্যান্ডগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে দাম-সংবেদনশীল বাজারগুলোতে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈশ্বিক বাজারে সামগ্রিকভাবে সরবরাহ কমলেও কৌশলগত সুবিধা ও প্রিমিয়াম পণ্যের কারণে অ্যাপল তাদের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।





Add comment