চাঁদে বসবাসে মানবদেহে বড় পরিবর্তন

দীর্ঘদিন পর আবারও চাঁদকে ঘিরে মানব অনুসন্ধান নতুন গতি পেয়েছে। ১৯৭২ সালে মহাকাশ সংস্থার অ্যাপোলো কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর এবার আর্টেমিস–২ অভিযানের মাধ্যমে চার নভোচারী চাঁদের নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছান। ১ এপ্রিল শুরু হওয়া ১০ দিনের এই অভিযানে তারা চাঁদের মাটিতে অবতরণ না করলেও পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, চাঁদের পেছনের এমন এক অঞ্চলে গিয়েছেন যেখানে আগে কোনো মানুষ পৌঁছায়নি। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ভবিষ্যতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে একটি স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করা, যেখানে নভোচারীরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করে গবেষণা চালাতে পারবেন।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, চাঁদে দীর্ঘ সময় বসবাস মানুষের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এসব পরিবর্তন বোঝার জন্যই মূলত এই গবেষণাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। চাঁদের পরিবেশ পৃথিবীর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি প্রতিকূল। এই পরিবেশকে বিজ্ঞানীরা ‘স্পেস এক্সপোজোম’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে প্রতিনিয়ত মানবদেহকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।

চাঁদের মহাকর্ষ শক্তি পৃথিবীর মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ। এই কম মহাকর্ষের কারণে মানবদেহের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। শরীরের রক্ত, অক্সিজেন এবং অন্যান্য তরলের চলাচলের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্তনালির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এছাড়া চাঁদে পৃথিবীর মতো শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র নেই, যা মানুষকে মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে সুরক্ষা দেয়। ফলে সেখানে অবস্থানরত নভোচারীরা সরাসরি এই বিকিরণের মুখোমুখি হবেন। এই বিকিরণ ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ক্যানসার কিংবা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে চাঁদের মাটিতে থাকা সূক্ষ্ম ও বিষাক্ত ধূলিকণাও ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

শুধু শারীরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও চাঁদে বসবাস বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘ সময় পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার ফলে একাকিত্ব, চাপ এবং মানসিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের চাঁদ অভিযানে মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে মানুষ স্বভাবগতভাবেই অভিযোজনক্ষম। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা চাঁদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীরা প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, যাতে তাদের পেশি ও হাড় ক্ষয় না হয়। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চাঁদের জন্য বিশেষ ধরনের ব্যায়াম যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এছাড়া নভোচারীদের জন্য ব্যক্তিগত শারীরিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে খাদ্য তালিকা নির্ধারণ করা হবে। চাঁদের ঘাঁটিতে গ্রিনহাউস তৈরি করে সবজি উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো চাঁদের মাটি ব্যবহার করে বিশেষ কাঠামো তৈরি করা, যা নভোচারীদের মহাজাগতিক বিকিরণ এবং ছোট উল্কাপিণ্ডের আঘাত থেকে রক্ষা করবে। পাশাপাশি ছোট আকৃতির সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্র ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পৃথিবীর মতো মহাকর্ষ তৈরি করার বিষয়টিও পরীক্ষাধীন রয়েছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, চাঁদে বসবাস মানবজাতির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে নানা শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও প্রস্তুতিই ভবিষ্যতের মহাকাশ বসতির সাফল্য নির্ধারণ করবে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed